পণ্যপুঁজা: যুডি কক্স
পণ্যপুঁজা
মূল: জুডি কক্স
অনুবাদ: স ম আজাদ
[অনুবাদকের কথা: জুডি কক্সের মূল প্রবন্ধটির শিরোনাম What is commodity fetishism? প্রবন্ধটি লন্ডন থেকে প্রকাশিত Socialist Workerএ Friday 03 April 2026-এর ইস্যু নং ৩০০০-এ ছাপা হয়। প্রবন্ধটির বাংলা অনুবাদে শিরোনাম দেয়া হলো পণ্যপুঁজা। জুডি কক্স দেখিয়েছেন পণ্যপুঁজা নিছক কেনা-কাটার ঝোঁক নয়। এর অর্থ জড় বস্তু এবং প্রতিষ্ঠানের ওপর মানব ক্ষমতার আরোপায়ণ যাতে আমাদের মনে হয় পণ্য মানব শ্রমের ফসল না হয়ে বরং আমাদের ওপর আধিপত্যশীল একটা সত্তা। প্রবন্ধের লেখক ইস্ট লন্ডনে বসবাসকারী একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। তিনি সমাজতান্ত্রিক লেখক এবং বক্তা। তিনি লন্ডন থেকে প্রকাশিত তাত্তিক জার্নাল ইন্টারন্যাশনাল সোশ্যালিজমের সম্পাদনা বোর্ডের সদস্য। তাঁর প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হলো: The Women’s Revolution: Russia 1905–1917 (Haymarket, 2019), Rebellious Daughters of History (Redwords, 2020)]
সিস্টেমকে অথবা এমনকি আমাদের জীবনকে পরিবর্তন করতে অনেক সময় আমরা অসহায় হয়ে পড়ি। সেই ক্ষমতাহীনতা বোধের একটি ব্যাখ্যা যাকে মার্কস বলেন পণ্য পুঁজা। পণ্যপুঁজার অর্থ এই নয় যে আরও বেশী বেশী করে জিনিষপত্র কেনা। এটা হলো জড়বস্তু এবং প্রতিষ্ঠানসমূহের ওপর মানব ক্ষমতা আরোপণ (attribution of human powers)। এটা একটি উপায় যাতে আমরা যে সমস্ত বস্তুসামগ্রী তৈরী করি সেগুলো আমাদের ওপর কর্তৃত্ব করে।
পণ্যপুঁজার বিকাশ ঘটেছে কারণ পুঁজিতন্ত্র হলো ইতিহাসে সার্বজনীন পণ্য উৎপাদনের (generalised commodity production) প্রথম ব্যবস্থা। যেমনটি মার্কস বলেন, যে সমস্ত সমাজে উৎপাদনের পুঁজিতান্ত্রিক ধরন বজায় থাকে, সেখানে সমাজের সম্পত্তি দৃশ্যমান হয় পণ্যসমূহের বিশাল সম্ভাররূপে।
আমাদের সকল অর্জন, যাকিছু আমরা উৎপাদন করি, এর সবকিছুই প্রতীয়মান হয় কেনা-বেচার উপাদান হিসেবে। তাঁদের প্রয়োজন মেটাতে মানব সত্তা সবসময় বস্তুসামগ্রী তৈরী করতে শ্রম দেয়। অতীতে উৎপাদকবৃন্দ যা তেরী করতেন সেগুলোর সঙ্গে তাঁদের সরাসরি সম্পর্ক ছিল। তাঁরা ফসল ফলাতেন, সেলাই করতেন, বয়ন করতেন, খোদাইয়ের কাজ করতেন, রুটি তৈরী করতেন এবং পানীয় প্রস্তুত করতেন। এখন আমরা আর আমাদের সমাজের চাহিদা মেটাতে উৎপাদন করি না। আমরা পণ্যোৎপাদন করি অজানা বাজারে বিক্রয় করতে (to be sold on the anonymous marketplace)। ভোক্তাদের স্বতন্ত্র উৎপাদকদের সঙ্গে আর কোনো সম্পর্ক থাকে না। এই সম্পর্কগুলো রূপান্তরিত হয় তারা যে পণ্যগুলো উৎপন্ন করে তাদের মধ্যকার সম্পর্করূপে।
মার্কসবাদী তাত্তি¡ক ইস্তভান মেসজোরাস (Istvan Meszaros) ব্যাখ্যা করেন, টাকার প্রতি জনসাধারণের দৃষ্টিভঙ্গি, নিঃসন্দেহে, পুঁজিতান্ত্রিক পণ্য-পুঁজার বৈশিষ্ট্যমন্ডিত দৃষ্টান্ত, এটি চুড়ান্ত অবস্থায় পৌঁছে সুদ ধারণকারী পুঁজিতে (in interest bearing capital)। মানুষজন মনে করেন যে তাঁরা দেখেন টাকা আরও টাকা তৈরী করে, এর স্ব-প্রসারণশীল মূল্য আছে । শ্রমিক, মেশিন, কাচামাল- উৎপাদনের সকল নিয়ামক কেবলমাত্র সহায়করূপে অবনমিত, এবং টাকা নিজেই সম্পদের উৎপাদক হয়ে গেছে। পণ্যের আধিপত্য এতটাই সর্বব্যাপী যে এটাকে অনিবার্য মনে হয়।
উৎপাদন বর্ধিতভাবে দক্ষতার বিশেষায়ন এবং প্রক্রিয়ার যৌক্তিকীকরণ দিয়ে পরিচালিত হয়। এটি সার্বিক উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করে, এর অর্থ আমরা চুড়ান্ত পণ্যের (finished product) ওপর থেকে দৃষ্টি হারিয়ে ফেলি এবং এর ওপর আমরা সন্তুষ্টি নিতে পারি না।
হাঙ্গেরীয় মার্কসবাদী গিওর্গ লুকাস বর্ণনা করেন কীভাবে এই বিশেষায়ন সমগ্রের প্রতিটি ইমেজকে ধ্বংস করে”। সবকিছু প্রতীয়মান হয় ভাঙ্গা এবং টুকরো টুকরো হিসেবে। পণ্যের সাপেক্ষে যা সংঘটিত হয় তাই সমাজে সাধারণীকৃত হয়। এতে প্রতীয়মান হয় যে কিছু একটা রহস্যময় শক্তি যাকে বাজার বলে তাই দাম বৃদ্ধি-হ্রাসের কারণ সংঘটিত করে। এটি কর্ম-সংস্থান সৃষ্টি এবং ধ্বংস করে, আর নির্বাচিত সরকারগুলোকে শৃঙ্খলিত করে। তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাপার হলো এই যে ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণী ভিন্নভিন্নভাবে পুণ্যপুঁজার অভিজ্ঞতা লাভ করে। লুকাস যুক্তি দেন যে শাসকশ্রেণী কখনো পুণ্যপুঁজার ঊর্ধ্বে উঠতে পারে না। তারা পুঁজিতন্ত্রের শৃঙ্খলে বাঁধা পড়ে এবং পুঁজিতন্ত্রকে স্বাভাবিক এবং অনিবার্য হিসেবে উপলব্ধি করে। শ্রমিকশ্রেণীও পুণ্যপুঁজা দিয়ে মূর্ত হয় (shaped by)। শ্রমিকশ্রেণী চমৎকার অবস্থানে বিদ্যমান। তাঁরা পুঁজিতন্ত্র থেকে পুণ্যপুঁজার নেকাব ছিন্ন করতে পারে, কারণ সমাজের সম্পদ সৃজনে তাঁদের সংগ্রাম তাঁদের নিজেদের সংগোপন ভূমিকা উম্মোচন করে। লুকাস সুপারিশ করেন যে স্বতন্ত্র পদ্ধতিগত উপায়ের জন্য কেবলমাত্র শ্রমিকশ্রেণীর সামর্থ্য রয়েছে বিপ্লবী চেতনা (revolutionary consciousness) বিকশিত করার। কারণ তাঁদের সৃজনশীল সামর্থ্য থেকে তাঁদের অর্জনগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে পণ্যে পরিণত হয়।
শ্রেণী সংগ্রামের অর্থ হলো এই যে তাঁদের নিয়ন্ত্রণের বাইরের শক্তির ধাক্কার সময়ও শ্রমিকগণ তাদের নিজেদের বিচ্ছিন্ন সত্তা হিসেবে দেখেন না। তাঁদের ক্ষমতা রয়েছে ঘটনাবলীর ওপর প্রভাব বিস্তারে। কেন পুঁজিতন্ত্র আমাদের ক্ষমতাহীন অনুভব করায় এবং কীভাবে শ্রমিকশ্রেণী তাঁদের যৌথ ক্ষমতা উপলব্ধি করতে পারে – এই উভয় বিষয়ই পণ্যপুঁজা ব্যাখ্যা করে।
টাঙ্গাইল থেকে প্রকাশিত পূর্বাকাশ পত্রিকায় হয় রোববার, ২০ বৈশাখ, ১৪৩৩ সংখ্যায়
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন