পিউশে: আত্মহত্যা প্রসঙ্গে কার্ল মার্কস


পিউশে: আত্মহত্যা প্রসঙ্গে

কার্ল মার্কস

অনুবাদ: স ম আজাদ

উৎসর্গ: আমার আব্বা মোঃ মোফাজ্জল হোসেনকে


কেবলমাত্র বিশেষ শ্রেণীসমূহের মধ্যের সম্পর্কেই নয়, বরং আধুনিক সমাজের সকল পরিমন্ডল ও আঙ্গিকে আধুনিক জীবনের দ্বন্দ্বসমূহ (contradictions) ও অস্বাভাবিকতা প্রদর্শন হলো সমজের ফরাসি সমালোচনার কমপক্ষে অংশত বৈশিষ্ট্যমন্ডিত সদগুণ। এবং এটি বিশদে দেখিয়েছে স্বয়ং জীবনের উষ্ণতা, দৃষ্টিভঙ্গির উদারতা, পরিশুদ্ধ সচ্ছতা, এবং আত্মার সাহসী মৌলিকত্ব, যেগুলো অন্য জাতির মধ্যে অন্বেষণ বৃথা। উদাহরণস্বরূপ, জীবনের সম্পর্কসমূহের চিন্তার ক্ষেত্রে ফরাসিদের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে ধারণা পেতে ওয়েন ও ফুরিয়ের-এর ক্রিটিক্যাল লেখালেখিগুলো তুলনা করুন। এটা “সমাজতন্ত্রী” লেখকদের কখনো একমাত্র দায়িত্ব নয় যে তারাই কেবলমাত্র সামাজিক অবস্থাবলীর ক্রিটিক্যাল উপস্থাপনের দিকে নজর দেবেন; বরং সাহিত্যের প্রত্যেকটি ক্ষেত্রের লেখকদের, বিশেষতঃ উপন্যাস ও স্মৃতিকথার লেখকদেরও দায়িত্ব। জ্যাক পিউশে লিখিত “Mémoires tires des Archives de la Police etc” হতে আত্মহত্যা এর ওপর কিছু উদ্ধৃতি দিয়ে আমি এই ফরাসি সমালোচনার একটি উদাহরণ দেব। একই সাথে দেখানো যেতে পারে যে মানব হিতৈষী বুর্জোয়াদের ধারণার ভিত্তিভূমি ছিল কেবলমাত্র প্রলেতারিয়েতদের জন্য যতসামান্য রুটি ও যতসামান্য শিক্ষা যোগানোর ব্যাপার, যার জন্য কেবলমাত্র সমাজের বর্তমান অবস্থা দ্বারা শ্রমিক জনগণের বিকাশ রুদ্ধ, নইলে বিদ্যমান দুনিয়া হতো সম্ভাব্য সব দুনিয়ার মধ্যে শ্রেষ্ঠতম।


জ্যাক পিউশে সহ অনেক অগ্রজ ফরাসি পেশাজীবিগণ যাদের অধিকাংশ মৃত্যুবরণ করেছেন, এরা ১৭৮৯ হতে অনেক অভ্যুত্থান, অনেক নৈরাশ্য, উদ্দীপনা, সংবিধান, শাসক, পরাজয় ও জয়, বিদ্যমান সম্পত্তি, পরিবার এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত সম্পর্কসমূহ, এককথায় ব্যক্তিগত জীবন-এর সমালোচনার মধ্য দিয়ে জীবন-যাপন করেছেন। এগুলো প্রতীয়মান হতো তাঁদের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাসমূহের প্রয়োজনীয় ফলাফল হিসেবে।

                                            

জ্যাক পিউশে (জন্ম ১৭৬০) অগ্রসর হন belles lettres থেকে চিকিৎসা, চিকিৎসা থেকে আইন, আইন থেকে প্রশাসন ও পুলিশে। ফরাসি বিপ্লবের পূর্বে তিনি Abbe¢Morellet-এর সাথে কাজ করছিলেন Dictionaire du commerce-এর উপর, যাহোক, যার কেবলমাত্র প্রোসপেক্টাসটি প্রকাশিত হয়েছিলো, এবং ঐ সময়ে তিনি প্রধানতঃ রাজনৈতিক অর্থনীতি ও প্রশাসন নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। পিউশে খুব স্বল্প সময়ের জন্য ফরাসি বিপ্লবের অনুসারী ছিলেন। তিনি শীঘ্র রয়ালিস্ট পার্টির দিকে ঝুঁকে পড়েন, কিছু দিনের জন্য Gazette de France-এর সম্পাদক হন এবং পরে তিনি এমনকি Mallet du Pan থেকে কুখ্যাত রয়ালিস্ট Mercure-এর দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। তাসত্ত্বেও, তিনি খুব চতুরতার সাথে বিপ্লবের মধ্য দিয়ে তার পথ করে নেন, কখনো নির্যাতিত হয়ে, কখনো প্রশাসন বিভাগ ও পুলিশে ব্যাপৃত থেকে। ১৮০০ সনে তিনি  পাঁচ খন্ডে Géographie commerçante প্রকাশ করেন, এটি প্রথম কনসাল বোনাপার্ট-এর মনোযোগ আকর্ষণ করে, এবং তিনি Conseil de commerce et des arts-এর সদস্য হিসেবে নিয়োগ পান। পরবর্তীতে তিনি François de Neufchâteau মন্ত্রণালয়ে একটি অধিকতর উচ্চ পদ দখল করেন। ১৮১৪-এ রেসটোরেশন (The Restoration) তাকে সেন্সর (censor) পদে নিয়োগ দেয়। ১০০ দিনের সময়ে তিনি অবসর নেন। বারবোনদের রেসটোরেশনে (At the restoration of the Bourbons) তাকে প্যারিস পুলিশ প্রিফেকচারে আর্কাইভের কিপার (keeper of archives) পদে নিয়োগ দেয়া হয়, এই পদে তিনি থাকেন ১৮২৭ পর্যন্ত। সরাসরি ও লেখক হিসেবে, সংবিধান সভার (Constituent Assembly) স্পিকারবৃন্দ, কনভেনশন, ট্রাইবুনেট (Tribonate) ও রেসটোরেশনের অধীনে চেম্বারস অব দ্যা ডেপুটিজের সদস্যবৃন্দ, এদের সকলের ওপর পিউশে প্রভাব ছাড়া ছিলেন না। ইতঃমধ্যে উল্লেখিত Geography of Commerce ছাড়া তাঁর অনেক কাজ, যার অধিকাংশ অর্থনৈতিক, এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সুপরিচিত হলো ফ্রান্সের পরিসংখ্যান [J. Peuchet, Statistique élémentaire de la France] (১৮০৭)।


পিউশে তাঁর স্মৃতিকথা লিখেন, এর উপকরণসমূহ তিনি অংশত সংগ্রহ করেন প্যারিস পুলিশের আর্কাইভ থেকে, অংশত পুলিশ ও প্রশাসনে তাঁর দীর্ঘ ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা থেকে, একজন প্রবীণ ব্যক্তি হিসেবে এবং সেগুলো প্রকাশিত হয় কেবলমাত্র তাঁর মৃত্যুর পরে, সুতরাং তাকে কোনোভাবেই “হঠকারি” সমাজতন্ত্রী ও কমিউনিস্টদের মধ্যে গণ্য করা যায় না, যারা আমাদের লেখকদের, কর্মকর্তাদের এবং পেশাজীবি নাগরিকদের সার্বিক দৌড়ের বিস্ময়কর ব্যাপ্তি  এবং ব্যাপক জ্ঞান সম্পর্কে সম্পূর্ণ ঘাটতির জন্য পরিচিত।


চলুন শোনা যাক আত্মহত্যা সম্পর্কে আমাদের প্যারিস পুলিশ প্রিফেকচারের আর্কাইভ কিপার কি বলেন:


আত্মহত্যার বার্ষিক সংখ্যাটি আমাদের মাঝে খুবই স্বাভাবিক ও পুনঃসংঘটনশীল, এটিকে অবশ্যি গণ্য করতে হবে আমাদের সমাজের ত্রুটিপূর্ণ সংগঠনসমূহের লক্ষণ হিসেবে। মাঝে মাঝে শিল্পের অচলাবস্থায় এবং সংকটে, খাদ্যের অপ্রতুলতা ও  কঠোর শীতের সময়, এই লক্ষণ সবসময় অধিকতর স্পষ্ট হয় এবং মহামারীর চরিত্র নেয়। তখন বেশ্যাবৃত্তি ও চৌর্যবৃত্তি একই হারে বৃদ্ধি পায়। যদিও আত্মহত্যার একটা বড় উৎস হলো দারিদ্র্য, কিন্তু আমরা এটা দেখতে পাই সকল শ্রেণীতে, অলস ধনীদের মাঝে, এমনকি শিল্পী ও রাজনীতিকদের মাঝে। এটি বৃদ্ধির কারণগুলোর প্রকরণ যেন মনে হয় নৈতিকতাবাদীদের একঘেয়ে ও উদাসীন নিন্দাকে পরিহাস করে।


আরো উদারভাবে অন্বিত প্রকৃতির মধ্যে, নিঃসন্দেহে আত্মহত্যার কারণগুলো হলো ক্ষয়রোগের প্রতি বর্তমানে বিজ্ঞানের উদাসীনতা ও অকার্যকরতা, প্রতারণাময় ভালবাসা, হতাশকর লক্ষ্য, পারিবারিক দুর্ভোগ, অবদমিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা, একঘেয়ে জীবনের প্রতি অসন্তুষ্টি, দমনকৃত উৎসাহ, এবং স্বয়ং জীবনের ভালবাসা, ব্যক্তিত্বের এই তেজোদীপ্ত চালিকা শক্তি প্রায়ই ধাবিত করে ঘৃণিত অস্তিত্বের অবসানের দিকে।



মাদাম দি স্তাইয়েল (Madame de Staël), যার  বড় গুণ হলো মামুলি বিষয়কে অপূর্ব শৈলীতে প্রকাশ করা। তিনি দেখাতে চেষ্টা করেন যে আত্মহত্যা হলো প্রকৃত বিরুদ্ধ কাজ, এবং তাই এটাকে সাহসী কাজ হিসেবে গণ্য করা যায় না। তিনি বিশেষভাবে দাবী করেন যে হতাশায় নিমজ্জিত হওয়ার চেয়ে এর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করাই উচিত। দুর্ভাগ্য পীড়িত আত্মাসমূহের ওপর এ ধরনের যুক্তি কমই প্রভাব ফেলে। তারা ধার্মিক হলে অধিকতর ভালো দুনিয়ার অন্বেষণ করেন; কিন্তু বিপরীতক্রমে তারা যদি কোনো কিছুতে বিশ্বাস না করেন, তবে তারা কোনো কিছুতে শান্তি অন্বেষণ করেন না। তাদের চোখে দার্শনিক বুলিবাগিশীর মূল্য নেই এবং দুর্ভোগ থেকে তা দুর্বল ভরসার জায়গা। সর্বোপরি, যে কাজটি প্রতিনিয়ত সংঘটিত হয়, তা প্রকৃতি বিরুদ্ধ বলা সমীচিন নয়। আত্মহত্যা কোনভাবেই প্রকৃতি বিরুদ্ধ নয়, যেহেতু এটি আমরা প্রতিদিন দেখি। যা প্রকৃতির বিরুদ্ধে তা সংঘটিত হয় না। বিপরীতক্রমে, আমাদের সমাজের প্রকৃতির মধ্যে নিহিত আছে অনেক আত্মহত্যার সংঘটন, যদিও তাতারগণ নিজেরা নিজেদের হত্যা করে না। সুতরাং সকল সমাজে একই ফলাফল হয় না। সুতরাং যা আমাদের নিজেদেরকে বলতে হবে তা হলো এই যে আমাদের সমাজের সংস্কারের জন্য কাজ করতে হবে এবং এটিকে উচ্চতর পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে। সাহসের জন্য যেমন, যদি উত্তেজনার প্রত্যেকটি ধরনের প্রভাবের অধীনে যুদ্ধক্ষেত্রে দিনের আলোয় মৃত্যুকে তুচ্ছ করা সাহসিকতা বলে গণ্য করা হয়, তবে কেউ যদি অন্ধকার নির্জনতায় নিজেকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়, তা সাহসের অভাব বলে প্রমাণ হয় না। মৃতকে তিরস্কার করে এ ধরনের বিতর্কিত প্রশ্নের মিমাংসা হয় না।

আত্মহত্যার বিরুদ্ধে যাকিছু বলা হয় সেগুলো ধারণাবলীর একই চক্রের মধ্যে বার বার ঘুরতে থাকে।  মানুষজন এর বিরুদ্ধে ডিক্রিজ অব প্রোভিডেন্স এর উদ্ধৃতি দেয়, কিন্তু স্বয়ং আত্মহত্যার অস্তিত্ব হলো তার দুর্বোধ্য ডিক্রিসমূহের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট প্রতিবাদ। সমাজের ওপর আমাদের দাবীসমূহকে ব্যাখ্যা না করে বা বাস্তবায়িত না করেই, তারা আমাদের কাছে এই সমাজের প্রতি আমাদের দায়িত্বসমূহের কথা বলে । এবং পরিশেষে, বেদনাতে নিমজ্জিত হওয়ার চেয়ে বরং এটিকে পরাস্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করে তারা একে হাজার গুণ মহিমান্বিত করেন, এটা এমন একটা গুণ (merit) যা সম্ভাবনাসমূহ (prospects) উম্মুক্ত করার মতই দুঃখজনক। সংক্ষেপে, তারা আত্মহত্যাকে কাপুরুষতার কাজ বলে গণ্য করেন, আইন, [সমাজ] ও সম্মানের বিরুদ্ধে অপরাধ বলে মনে করেন।

‘‘অনেক অভিশাপের ঝুঁকি সত্ত্বেও কেন মানুষজন নিজেদের হত্যা করে? কারণ হতাশায় নিমজ্জিত মানুষদের রক্ত তাদের শিরা দিয়ে ঠান্ডা প্রাণীদের মতন একইভাবে প্রবাহিত হয় না, যারা ঐ সমস্ত অর্থহীন শব্দগুচ্ছ (fruitless phrases) তৈরী করতে সময় নেয়। মানুষকে মানুষের নিকট রহস্যময় মনে হয়; তাকে কেবলমাত্র দোষ দেয়া যেতে পারে, সে অজ্ঞেয়। যখন আমরা দেখি, যে সমস্ত প্রতিষ্ঠানের অধীনে ইউরোপ বাস করে সেগুলো কীভাবে লঘু চিত্তভাবে জাতিসমূহের রক্ত ও জীবনকে (blood and life)পরিত্যাগ করে, কীভাবে সভ্য বিচারব্যবস্থা এর নিজের চারপাশকে পর্যাপ্তভাবে বন্দীশালা, শাস্তিসমূহ এবং মৃত্যুর যন্ত্রসমূহ দিয়ে পরিবেষ্টিত করে রাখে, যাতে এর অনিশ্চিত সিদ্ধান্তসমূহ জারী থাকে; যখন আমরা দেখি শ্রেণীসমূহের বিপুল সংখ্যক সব দিক থেকেই দুর্যোগে নিপতিত, এবং সামাজিক অচ্ছুত বর্গসমূহ যারা নিষ্ঠুর ঘৃণা দিয়ে আঘাত প্রাপ্ত, মনে হয় যে প্রতিরোধযোগ্য, সম্ভবত তাদের আবর্জনাপূর্ণ অবস্থান থেকে সরিয়ে নেয়ার ঝামেলা মুক্ত হতে। যখন আমরা এই সবকিছু দেখি, আমরা বুঝতে অসমর্থ হই যে কী আমাদের অধিকার প্রদান করে ব্যক্তিকে নিরঙ্কুশভাবে নিজের মাঝে  একটি অস্তিত্বকে (in himself an existence) সমীহ করতে আদেশ দিতে যেটি আমাদের প্রথাসমূহ, আমাদের সংস্কারসমূহ, আমাদের আইনসমূহ এবং আমাদের নৈতিকতাসমূহ দিয়ে সাধারণত পায়ের নীচে পদদলিত হয়।

“এটি ভাবা হতো যে মর্যদাহানিকর শাস্তিসমূহ দ্বারা এবং কলঙ্ক দ্বারা অপরাধীর স্মৃতিপটে ছাপ দিয়ে আত্মহত্যাকে প্রতিরোধ করা যেতো। মানুষজনকে এভাবে কলঙ্কিত করার অর্থহীনতার কথা কে বলতে পারে, যখন তারা সেখানে নেই তাদের অবস্থার পক্ষে ওকালতি করতে। প্রসঙ্গক্রমে, দুর্ভাগ্য প্রপীড়িতগণ সেটি দ্বারা কমই উদ্বিগ্ন; এবং আত্মহত্যা কাউকে দায়ী করে, এটি সর্বোপরি দায়ী করে পেছনে থাকা মানুষজনকে, কারণ এই জনগনের মধ্যে একজন নেই, যে এটার যোগ্য যে তার জন্য যেকেউ বেঁচে থাকুক। নৈরাশ্যের ফিসফিসানিসমূহের বিরুদ্ধে বালসুলভ ও নিষ্ঠুর উপায় বিজয়ীভাবে উদ্ভাবিত হয়েছে কী? যিনি দুনিয়া থেকে পালাতে চান, তার লাশের প্রতি সম্ভাব্য অপমানসমূহ সম্পর্কে তার কি কোনো পরোয়া থাকতে পারে? তিনি কেবলমাত্র তাদের ওপর আর একটি কাপুরুষোচিত কৃতকর্ম দেখেন জীবিতদের পক্ষ থেকে। বাস্তবিকই এটা কি ধরনের সমাজ, যেখানের নিযুত নিযুতের মধ্যে একজন প্রগাঢ়তম নির্জনতা দেখে; যেখানে একজন অদম্য ইচ্ছা দিয়ে নিজেকে হত্যা করতে আচ্ছন্ন হয়, যে কারো অজ্ঞাতসারে? এই সমাজ সমাজ নয়, রুশো যেমনটি বলেন এটি বুনো প্রাণী বসবাসকারী একটি মুরুভূমি। পুলিশ প্রশাসনে যে সমস্ত পদে আমি অধিষ্ঠিত ছিলাম, সেগুলোতে আত্মহত্যা ছিল আমার দায়িত্বের অংশ। আমি জানতে চাইতাম তাদের প্রণোদিত করতো যে কারণগুলো সেগুলোর মধ্যকার কিছুর ফলাফল কি দূর করা যেতো। আমি বিষয়টির উপর বিস্তৃত কাজের উদযোগ নিয়েছিলাম।” আমি দেখেছিলাম যে সমাজের বর্তমান অবস্থার সামগ্রিক সংস্কার ব্যতিত যেকোনো প্রচেষ্টাই বৃথা। [ স্মৃতিকথার লেখকের যুক্তিসমূহ থেকে স্বয়ং মার্কস এই উপসংহারটি সূত্রায়িত করেছিলেন। এই বাক্যের পরিবর্তে পিউশে বলেন: “কোনো তাত্ত্বিক অনুসন্ধান ছাড়াই, আমি সত্য ঘটনা উপস্থাপনের চেষ্টা করবো।”]

খুবই উত্তেজিত প্রবণ ব্যক্তিগণ, গভীর সংবেদী সম্পন্ন আবেগিক সত্ত্বাগণ যে স্নায়বিক বৈকল্য দ্বারা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুকে অন্বেষণ করে, তার পেছনে যে কারণসমূহ কাজ করে, সেগুলোর মধ্যকার আমার আবিষ্কৃত প্রধান নিয়ামকগুলো হলো দুর্ব্যবহার, অবিচারসমূহ, গোপন শাস্তিসমূহ; যেগুলো কঠোর পিতামাতা ও বয়োজেষ্ঠগণ তাদের উপর নির্ভরশীল মানুষজনের ওপর প্রয়োগ করে। বিপ্লব সকল জুলুমকে উৎখাত করেনি। যে সমস্ত পাপকর্মের জন্য স্বৈরাচারী কর্তৃপক্ষসমূহকে অভিযুক্ত করা হয়, সেগুলো doe family-তে বজায় থাকে, যেখানে তারা সংকটসমূহের কারণ ঘটায়, যেগুলো বিপ্লবসমূহের সংকটসমূহের অনুরূপ।

অনুরাগ ও মেজাজের মধ্যকার সম্পর্কাবলী, ব্যক্তিগণের মধ্যকার সত্যিকার সম্পর্কাবলী প্রথমে আমাদের নিজেদের মধ্যে তৈরী করতে হবে খোদ ভিত্তিসমূহ থেকে এবং আত্মহত্যা হলো হাজারের মধ্যে একমাত্র একটি এবং সার্বজনীন সামাজিক সংগ্রামের লক্ষণসমূহের একটি, যা চিরদিনের জন্য অভিনব কর্মসমূহের প্রতি তাড়না করে এবং যা থেকে অনেক যোদ্ধাগণ নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয় কারণ উপদ্রুতদের মধ্যে তারা গণনাকৃত হতে ক্লান্ত, অথবা কারণ ফাঁসিকৃতদের মধ্যে সম্মানের জায়গা দখলের চিন্তার বিরুদ্ধে তারা বিদ্রোহ করে। যদি আপনি কিছু দৃষ্টান্ত চান, আমি সেগুলো চয়ন করবো প্রামাণিক প্রোটোকলসমূহ থেকে।

১৮১৬ সনের জুলাই মাসে জনৈক দর্জির কন্যা একজন কসাইয়ের সাথে বাগদান সম্পন্ন করে। সে ভালো নৈতিকতা সম্পন্ন, মিতব্যয়ী ও কঠোর পরিশ্রমী তরুণ ছিল। সে তার সুন্দরী কনের প্রতি খুবই অনুরক্ত ছিল, যে তাকেও খুব ভালোবাসতো। তরুণীটিseamstress ছিল, যারা তাকে জানতো তাদের সবার শ্রদ্ধা সে উপভোগ করতো, এবং পাত্রের পিতামাতা তাকে খুবই ভালোবাসতো। এই ভালোমানুষেরা সেই দিনটিকে তরান্বিত করতে কোনো সুযোগই হাতছাড়া করতে চায় না, যখন সে তাদের পুত্র বধু হবে। তাদের দেয়া পার্টিগুলোতে সে হতো রাণী ও আইডল।

বিবাহের সময় নিকটবর্তী হতে থাকলো; দুটি পরিববারের মধ্যে সকল আয়োজন  সম্পন্ন করা হলো এবং চুক্তিসমূহ সম্পাদিত হলো। রেজিস্ট্রারের সাথে সাক্ষাতের জন্য নির্ধারিত দিনের প্রাক্কালে, বরের পরিবারের সাথে তরুণী কন্যা ও তার পিতামাতার রাতে আহার করার  কথা ছিল। একটি অতাৎপর্যপূর্ণ ঘটনায় এতে বাধা পড়ে। ধনী খদ্দেরদের ফরমায়েসগুলো মেটাতে গিয়ে দর্জি ও তার স্ত্রীকে ঘরে আটকে থাকতে হয়। তারা তাদের অ্যাপোলজি পাঠিয়ে দেয়; কিন্তু কসাইয়ের মা নিজেই তার পুত্রবধুকে নিতে আসে, যাকে অনুমতি দেয়া হয়েছিলো তার সাথে যাওয়ার জন্য।

প্রধান প্রধান অতিথিদের অনুপস্থিতি সত্ত্বেও খাবার-দাবার ছিলো খুবই ঝলমলে। অনেক পারিবারিক জোকস বলা হয়, যা বিবাহের পরিপ্রেক্ষিতকে বেঁধে অনুমোদনযোগ্য করে। তারা পান করে, তারা গায়; তারা ভবিষ্যত সম্পর্কে কথা বলে। একটি ভালো বিবাহের আনন্দগুলো নিয়ে আগ্রহসহকারে আলোচনা করা হয়। তারা একেবারে শেষ রাত অবধি টেবিলে ছিলো। সহজে ব্যাখ্যা যোগ্য প্রশ্রয় দ্বারা  বাগদানকৃত দম্পতির নিরব বোঝাপড়ার দিকে তরুণের পিতামাতা চোখ বন্ধ করে থাকে। তাদের হাত একে অন্যকে অন্বেষণ করে, ভালোবাসা ও অন্তরঙ্গতা মস্তিষ্কে চলে আসে। অধিকন্তু, বিবাহ সুসম্পন্ন ছিলো বলে বিবেচনা করা হতো এবং এই তরুণ-তরুণী একটা দীর্ঘ সময় ধরে একে অপরের সাথে দেখা করতো সামান্যতম ভর্ৎসনার জন্য কারণ দেখানো ছাড়াই। পাত্রের পিতামাতার আবেগ, প্রাগ্রসর সময়, পারস্পরিক ইচ্ছা-প্রসূত কাম, যা নিয়ন্ত্রণমুক্ত হয় তাদের মেন্টরদের প্রশ্রয়ে, অনিয়ন্ত্রিত আনন্দ-উল্লাস যা সবসময় এই ধরনের ভোজন-উৎসবগুলোতে বজায় থাকে, এই সমস্ত কিছুর সাথে স্বয়ং সহাস্যে প্রদানকৃত সুযোগ সংযুক্ত হয়, এবং মদ যেটি মস্তিষ্কে উত্তেজনা চাড়িয়ে দেয়, সবকিছুই যে পরিণতিকে সম্ভবপর করে তোলে তা কল্পনা করা যেতে  পারে।প্রেমিক-প্রেমিকা আবার অন্ধকারে দেখা করে, যখন আলো চলে যায়। প্রত্যেকে না দেখার , কোনোকিছু না সন্দেহ করার ভান করে। এখানে কেবলমাত্র বন্ধুবর্গ আছে, কোনো ঈর্ষাকারী নেই, এটাই তাদের সুখ।

“কেবলমাত্র তরুণী কন্যা পরের সকালে তার পিতামাতার কাছে ফেরত আসে। সে একা ফেরত আসে, সে নিজে বিশ্বাস করে এই ঘটনাটিতে নিহিত আছে খুব সামান্য পরিমাণ দোষের প্রমাণ। সে অলক্ষ্যে তার কক্ষে প্রবেশ করে এবং তার প্রসাধনী তৈরী করে। কিন্তু যেইমাত্র তার পিতামাতা তাকে লক্ষ্য করে, ক্রোধে উম্মত্ত হয়ে তারা সবচেয়ে লজ্জাকর গালি ও খিস্তিখেউর বর্ষণ করে। পাড়া-প্রতিবেশী এটা প্রত্যক্ষ করে, কেলেঙ্কারির কোনো সীমা নেই। তার শ্লীলতা এবং তার গোপনীয়তার ভীষণ অবমাননা থেকে মেয়েটি যে অভিঘাতে ভোগে তা কল্পনা করুন। বৃথাই হতভম্ব মেয়েটি কি এটা তার পিতামাতার ওপর আরোপ করে যে তারা নিজেরা তার অবমাননা কারণ। সে তার ভুল, তার বোকামি, তার অবাধ্যতা স্বীকার করে যাতে সবকিছু আবার ঠিক হয়ে যায়। তার যুক্তি ও তার আর্তি দর্জি দম্পতিকে নিবৃত করতে ব্যর্থ হয়।”

সবচেয়ে ভীরু, প্রতিরোধবিমুখ মানুষজন নির্দয় হয় যেইমাত্র তারা তাদের চরম কর্তৃত্ব প্রয়োগ করে পিতামাতা হিসেবে। এই কর্তৃপক্ষের দুর্ব্যবহার যেন একটি স্থুল খেসারত, সকল বশ্যতা ও নির্ভরতার জন্য যাতে তারা নিজেদের হেয় করে অনিচ্ছা সত্ত্বেও বুর্জোয়া সমাজের কাছে।

“উভয় লিঙ্গের অনধিকার চর্চাকারীরা দৌড়ে দৃশ্যপটে আসে এবং কোলাহলে যোগ দেয়। এই কুৎসিত দৃশ্যের কারণে অপমানের অনুভূতি মেয়েটিকে নিজের জীবন নিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে। সে  অবমাননাকারী ও কুবচন বর্ষণকারী মানুষজনের ভীড়ের মাঝ দিয়ে দৌড়ে নীচে গেল। তার চোখগুলো পাগলামীতে ঘোলাটে হয়ে গেছে। সে সেইনে গেল, এবং নিজেকে নদীতে নিঃক্ষেপ করলো। মাঝি তাকে পানি থেকে মৃতাবস্থায় তুলে আনলো। তখনো তার গায়ে বিবাহের গয়নাপত্র সোভা পাচ্ছিল। বলাবাহুল্য যে যারা প্রথমে কন্যার বিরুদ্ধে চিৎকার করছিল, তারা তৎক্ষণাৎ তার পিতামাতার বিরুদ্ধে চলে গেল। এই আকস্মিক বিপর্যয় তাদের শূন্য আত্মাকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে তুললো। কিছুদিন পরে পিতামাতা পুলিশের কাছে এলো মেয়েটির গলায় পড়া সোনার চেইনের দাবীতে যেটি ছিলো তার হবু শ্বশুরের দেয়া উপহার, একটি রূপার ঘড়ি এবং অন্যান্য ছোট ছোট জুয়েলারি, যার সবগুলোই পুলিশের কাছে জমা ছিল। এই লোকগুলোকে আমি ভৎর্সনা করতে ব্যর্থ হইনি তেজোদীপ্তভাবে তাদের নির্বুদ্ধিতা ও নিষ্ঠুরতার জন্য। তাদেরকে ঈশ্বরের নিকট জবাবদীহি করতে হবে, তাদের অহংকারী কুসংস্কারসমূহ এবং ধামির্কতার অদ্ভূত ধরন যেগুলো বিরাজ করে নিম্ন স্তরের বণিক শ্রেণীসমূহের মাঝে সেগুলোর আলোকে এই পাগলগুলোকে এ কথা বললে তাদের ওপর কমই ছাপ পড়তো।

“লোভ তাদেরকে আমার নিকট এনেছিল, দুটি বা তিনটি স্মৃতিচিহ্ন কাছে রাখার অভিপ্রায়ে নয়। আমি ভেবেছিলাম যে আমি তাদের শাস্তি দিতে পারবো তাদের লোভের জন্য। তারা তাদের কন্যার অলঙ্কারাদি দাবী করছিলো। আমি তাদের এগুলো দিতে অস্বীকার করি। আমি সার্টিফিকেটগুলো রেখে দিয়েছিলাম, যেগুলো তাদের দরকার ছিল যে অফিসে নিয়ম অনুসারে জিনিসগুলো জমা ছিল, সেখান থেকে দাবী করতে। আমি যতদিন এই পদে আসীন ছিলাম ততদিন তাদের দাবীসমূহ ব্যর্থ করে দিতাম , এবং আমি সুখ পেতাম তাদের অপমানগুলোকে তাচ্ছিল্য করে।

“একই বছরে আমার অফিসে মার্তিনিকের ধনাঢ্য পরিবারগুলোর একটি থেকে আকর্ষণীয় চেহারার একজন ক্রেওল যুবক আসে। সে খুব জোরের সাথে একজন তরুণীর লাশ এর দাবীদারের নিকট হস্তান্তরে বাঁধা দেয়, তরুণীটি তার ভ্রাতৃবধু এবং লাশের দাবীদার হলো তার ভাই। সে নিজেকে নিজেই ডুবিয়ে দেয়। এ ধরনের আত্মহত্যা খুবই প্রচলিত। মৃতদেহ উদ্ধারে নিয়াজিত কর্মকর্তাবৃন্দ তাঁর দেহ উদ্ধার করে যে জায়গা থেকে তা Greve d’Argenteuil থেকে দূরে নয়। সবথেকে নির্বুদ্ধিতাপ্রসূত হতাশা সত্ত্বেও, মেয়েটির মাঝে বিদ্যমান সুপরিচিত সজ্ঞাসমূহের একটি থেকে নিমজ্জিত মেয়েটি তার স্কার্ফের পাড় দিয়ে তার পায়ের চারপাশ পেচিয়ে দিয়েছিলো। এই সংযত পূর্বানুমান নিঃসন্দেহে তার আত্মহত্যার প্রমাণ। তাকে পাওয়ামাত্র মর্গে নেয়া হয়। তার সৌন্দর্য, তার তারুণ্য, তার দামী পরিধেয় তার দুর্গতি সম্পর্কে হাজারটা অনুমানের জন্ম দেয়। তার স্বামী তাকে প্রথম শনাক্ত করেন, যার হতাশা সীমাহীন। তিনি এই দুর্ভাগ্যের গভীরতা পরিমাপ করতে পারেননি, কমপক্ষে আমাকে যা বলা হয়েছে। আমি নিজে তাকে আগে দেখিনি। আমি ক্রেওলকে বললাম যে অন্য সবার থেকে স্বামীর দাবী অগ্রগণ্য। তিনি ইতোমধ্যেই তার দুর্ভাগা স্ত্রীর জন্য চমৎকার মার্বেলের সমাধি প্রস্তর তৈরী করে রেখেছিলেন। ক্রেওল চিৎকার করল, ‘ সে তাকে হত্যা করার পর, সে দৈত্য। সে রাগে ইতস্ততঃ ঘুরতে লাগলো।

এই তরুণের উত্তেজনা ও হতাশা থেকে, তার অনুরোধ মঞ্জুরের জরুরী অনুনয় থেকে, তার চোখের জল থেকে , আমি বিশ্বাস করি আমি উপসংহারে উপনীত হতে পারি যে সে তার প্রেমে পড়েছিল, এবং আমি তাই বললাম। সে তার ভালোবাসাকে স্বীকার করলো। কিন্তু সে খুবই নিশ্চয়তার সাথে জোর দেয় যে তার ভ্রাতৃবধু এটা কখনো জানতো না। সে দিব্যি দিয়ে তা বলে। সে তার ভাইয়ের বর্বরতাকে আলোয় আনতে চাইলো, এমনকি এর অর্থ যদি এই দাড়ায় যে এটি তার নিজেকে কাঠগড়ায় দাড়ানো, কেবলমাত্র তার ভ্রাতৃবধুর সুনাম অক্ষুন্ন রাখতে, যার আত্মহত্যায় জনঅভিমত আরোপিত হয় চক্রান্তে। সে আমার সমর্থন প্রার্থনা করলো। আমি তার খন্ডিত, আবেগপূর্ণ জবানবন্দী (declarations) থেকে যে উপসংহারে এসেছি তা হল: তার ভাই Monsieur de M. . হলো ধনাঢ্য এবং শিল্পকলার সমঝদার, বিলাসী উঁচু সমাজের বন্ধু। তিনি এই তরুণীকে প্রায় এক বছর আগে বিয়ে করেছিলেন, দৃশ্যত পারস্পরিক অনুরাগ থেকে। আপনি দেখতে পাবেন তারা ছিল সবথেকে সুন্দর দম্পতি। বিবাহের পরে তরুণ স্বামীর দেহে সম্ভবত উত্তরাধিকার সূত্রে রক্তে ত্রুটি দেখা দেয় হঠাৎ করে এবং ভয়াবহভাবে। পূর্বে সে তার সুন্দর চেহারা এবং তার মার্জিত ব্যক্তিত্ব, চমৎকারিত্ব, গড়নের অনুপম পরিপূর্ণতার জন্য গর্বিত ছিলো, হঠাৎ এই ব্যক্তিটি অজ্ঞাত রোগ-ভোগের (scourge) শিকার হয়, যার ধ্বংসাত্মক পরিণতি প্রতিরোধে বিজ্ঞান তখন অসহায় ছিলো। পা থেকে মাথা পর্যন্ত সে খুব ভয়াবহভাবে বিকৃত হয়ে গিয়েছিলো। সে তার সব চুল হারিয়েছিলো, তার মেরুদন্ড বাঁকা হয়ে গিয়েছিলো। দিনের পর দিন দুর্বলতা ও আকুঞ্চন তাকে অদ্ভুৎভাবে পরিবর্তন করেছিলো, কমপক্ষে অন্যদের জন্য। তার আত্মানুরাগের জন্যই প্রতীয়মানকে অস্বীকার করার চেষ্টা। তারপরেও এই সবকিছু তাকে শয্যাশায়ী করতে পারেনি। একটি লৌহ কঠিন দৃঢ়তা মনে হয় তাকে স্কোর্জের আক্রমণের উপর জয়যুক্ত করেছিলো। সে দৃঢ়ভাবে তার নিজের ধ্বংস থেকে বেঁচে উঠেছিলো। তার দেহ একটি ধ্বংসাবশেষে পরিণত হয়েছিলো, কিন্তু তার আত্মা প্রফুল্লই ছিলো। সে অনবরত ভোজসভা দিয়ে চলছিলো, শিকারের পার্টিগুলোতে সভাপতিত্ব করছিলো যাতে সমৃদ্ধ ও জমকালো ধরনের জীবন-যাপন করা যায় যা মনে হতো তার চরিত্র ও স্বভাবের ধর্ম। কিন্তু যখন সে ভ্রমণে তার ঘোড়ায় ব্যায়াম করতো তখন স্কুল-বালক ও  পথ-শিশুদের অপমান, বিদ্রুপ, উপহাস এবং অসংখ্য ঘটনায় বন্ধুদের রূঢ় ও বিদ্রুপাত্মক হাসি, বন্ধু-বান্ধবদের উদ্বেগজনক সতর্কতা, যাতে সে নিজেকে উপহাসাস্পদরূপে উম্মোচিত করে, নারীদের প্রতি প্রেম-পূর্ণ আচরণে গুরুত্বারোপ করে, অবশেষে তার ভ্রান্তি দূর হয় এবং তার নিজের সম্পর্কে সতর্ক হয়। যত তাড়াতাড়ি সে নিজের কাছে তার কদর্যতা ও বিকৃতির স্বীকৃতি দিল এবং  এ সম্পর্কে সচেতন হলো, ততই তার স্বভাব তিক্ত হয়ে উঠলো; সে বিমর্ষ হলো। সে তার স্ত্রীকে পার্টিতে, বল নাচে, কনসার্টে নিয়ে যেতে কম আগ্রহী মনে হলো। সে তার গ্রামের বাড়ীতে পালিয়ে গেলো। সে সকল দাওয়াত উপেক্ষা করলো, হাজারটা উছিলায় মানুষকে পরিহার করলো। তার স্ত্রীকে দেয়া বন্ধুদের প্রশংসাগুলো তাকে ইর্ষান্বিত, সন্দেহপ্রবণ ও সহিংস করতো, যেগুলো সে সয়ে যেতো যে পর্যন্ত তার গর্ব তার শ্রেষ্ঠত্বের নিশ্চয়তা দিতো। তার স্ত্রী ছিল তার শেষ গর্ব এবং তার শেষ সান্তনা। যারা তাকে দেখতে অনুপ্রাণিত হতেন, তাদের সবার মধ্যে তার স্ত্রীর মন জয় করার দৃঢ় সংকল্প তিনি খেয়াল করলেন। এ সময়ে মার্তিনিক থেকে ক্রেয়োল আসল উদ্দেশ্য নিয়ে। বারবনদের ফ্রান্সের সিংহাসন পুরুদ্ধারে ক্রিয়োলের সফলতা এসেছিল বলে প্রতীয়মান হয়। তার বোনের বর তাকে আন্তরিকতার সঙ্গে গ্রহণ করেছিলো। সে (তরুণীটি) অসংখ্য অনুষঙ্গে বিপর্যয়ে জড়িয়ে পড়েছিল, আগুন্তকটি যে সুবিধা সংরক্ষণ করতো তা হলো তার ভাইয়ের উপাধি, খুবই স্বাভাবিকভাবে Monsieur de M....  দেয়া হয়েছিল। ক্রেয়োল পরিবারের চারপাশে বিরাজমান নির্জনতা পূর্বানুমান করে, এর কারণ ছিল তার ভাইয়ের কিছু বন্ধুদের সঙ্গে ভাইয়ের ঝগড়া এবং হাজারটা পরোক্ষ ঘটনা যেগুলো দর্শনার্থীদের সরিয়ে রেখেছিল এবং অনুৎসাহিত করেছিল। ভালবাসার মোটিফের স্পষ্ট ধারনা ছাড়াই, যা তাকেও ঈর্ষান্বিত করে, ক্রেয়োল  বিচ্ছিন্নতার এই পদক্ষেপগুলোকে অনুমোদন দেয় এবং সেগুলোকে উৎসাহিত করে তার নিজের উপদেশ দিয়ে। Monsieur de M... শেষ করলো প্যাসিতে একটি সুন্দর বাড়ীতে স্থানান্তরিত হয়ে, যেটি খুব অল্প সময়ে মরুভূমি হয়ে গেল, ছোট ছোট বিষয়ে ঈর্ষা যোগ হয়ে। যখন এটা জানা না থাকে কোথায় রাশ টেনে ধরতে হবে, তখন এটি নিজের বিরুদ্ধেই চলে যায় এবং উদ্ভাবনীয় হয়ে পড়ে। সবকিছুই কাজ করে এটা বজায় রাখতে। সম্ভবত তরুণীটি তার বয়সের আমোদ-ফূর্তির ইচ্ছা পোষণ করতো। দেয়ালগুলো প্রতিবেশী বাড়ীগুলোর দৃশ্যপটে প্রতিবন্ধকতা তৈরী করে। দরজাগুলো সকাল-সন্ধ্যা বন্ধ থাকতো।

হতভাগ্য স্ত্রীকে সবচেয়ে অসহনীয় দাসত্বের শাস্তি দেয়া হয়, এবং কোড সিভিল ও সম্পত্তির অধিকারের ভিত্তিতে কেবলমাত্র Monsieur de M..  এই দাসত্বে বাধ্য করান, সামাজিক অবস্থাসমূহের উপর ভিত্তি করে যা ভালবাসার প্রতিদান দেয় প্রেমিক-প্রেমিকাদের মুক্ত অনুভূতির তোয়াক্কা না করে এবং ঈর্ষান্বিক স্বামীকে অনুমোদন দেয় তার স্ত্রীকে তালাবদ্ধ করতে যেভাবে কৃপণ তার রত্নভান্ডারের বাক্সকে আগলে রাখে, যেনো সে তার তালিকাভূক্ত সম্পত্তির একটি অংশ মাত্র।

রাতে Monsieur de M... সশস্ত্র বাড়ীটির চারপাশে কুকুরসহ সন্দেহজনক কোনকিছুর সন্ধানে টহল দেন। তিনি ধারণা করেন যে বালুকারাশিতে পথের চিহ্ন পেয়েছেন এবং অদ্ভূত সন্দেহের দিকে ভুলবশত ধাবিত করেন, যখন বাগানের মালি একটি মই নিয়ে যাচ্ছিলেন। বাগানের মালি নিজে একজন প্রায় ষাট বছর বয়সী মাতাল, তাকে গেটের দারোয়ান হিসেবে ন্যস্ত করা হয়েছিল। বঞ্চনার অন্তরাত্মা জানে এর অসংযমের সীমা-পরিসীমা নেই, এটা অদ্ভুত পর্যায়ে যেতে পারে। এই সবকিছুর অপাপবিদ্ধ সহযোগী ছিল ভাইটি, সে কমপক্ষে বুঝতে পেরেছিল যে তরুণীটির দুর্ভাগ্য গড়তে বরং সে সহায়তা করছে, যাকে দিনের পর দিন নজরদারীতে রাখা হয়েছিল, অপমানিত করা হয়েছিল, একটি সমৃদ্ধ ও আনন্দময় বিভাবনা দিতে পারে এমন সবকিছু থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল, সে মনমরা ও বিষন্ন হয়েছিল আগে যেমন সে ছিল মুক্ত ও হাসি-খুশী। সে কাঁদল ও তার চোখের জল গোপন করল, কিন্তু সেগুলোর চিহ্ন দৃশ্যমান ছিল। ক্রেয়ল তার বিবেক দিয়ে জর্জরিত হয়।

তার ভ্রাতৃ-বধুর নিকট নিজেকে প্রকাশ্যে ঘোষণা দেয়ার সংকল্পে এবং যে ভ্রান্তি নিশ্চিতভাবেই উৎপত্তি হয়েছিল তার ভালবাসার অলক্ষিত অনুভূতি থেকে তা সংশোধন করার জন্য সে অগোচরে এক সকালে গাছপালা শোভিত আনন্দ বাগানে গেল যেখানে বন্দীরা সময় সময় টাটকা বাতাস পেতে যায় এবং তার ফুলগুলোর যত্ন নেয়। আমাদের এটা বুঝতে হবে যে তার নিজের এই খুবই সীমিত স্বাধীনতার সুযোগ নেয়ার সময় সে জানতো যে সে তার ঈর্ষান্বিত স্বামীর নজরদারীতে আছে। এজন্য তার দেবরকে প্রচন্ড আতঙ্ক প্রকাশ করলো, যে প্রথম বারের জন্য অপ্রত্যাশিতভাবে তার সাথে মুখোমুখি হয়। সে তার হাতগুলো মোচড়ালো। ‘চলে যাও, স্বর্গের নামে’, সে ভীত হয়ে তার প্রতি চিৎকার করলো, ‘চলে যাও!’

“এবং বাস্তবিক, গ্রিনহাউজে তার লুকানোর সময়, Monsieur de M.. হঠাৎ আবির্ভূত হলেন। ক্রেয়ল কান্না শুনলেন, সে চেষ্টা করলো মনোযোগ দিতে। তার হৃদকম্পন তাকে বাধা দেয় নিজেকে সংবরণ করতে ন্যূনতম ভাষিক ব্যাখ্যা উপলব্ধিতে, স্বামীর দৃষ্টিগোচরে আসা কি উচিত, যা একটি দুর্ভোগময় ফল দিতে পারে। এই ঘটনা দেবরকে উৎসাহিত করে। অতঃপর সে নিজেকে দুর্ভোগগ্রস্থের রক্ষকরূপে দেখা দরকার বলে মনে করে। তার ভালবাসার  সব বাধা পরিত্যাগ করতে সে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। ভালবাসা আর সবকিছু পরিত্যাগ করতে পারে, কেবলমাত্র একে রক্ষা করার অধিকার ছাড়া, এই শেষ পরিত্যাগের জন্য সেকি কাপুরুষ হবে না। সে তার ভাইয়ের সাথে দেখা করা অব্যাহত রাখলো, খোলাখুলি তার সাথে কথা বলতে প্রস্তুত ছিল, তার নিজেকে তার নিকট প্রকাশ করতে, তাকে সবকিছু বলতে। Monsieur de M..এর তখন পর্যন্ত তার প্রতি কোনো সন্দেহ ছিল না, কিন্তু তার ভাইয়ের পীড়াপীড়ি এটাকে জাগিয়ে তোলে। এই আগ্রহের কারণসমূহ সম্পর্কে সম্পূর্ণ স্পষ্ট না হয়ে Monsieur de M... তাদের অবিশ্বাস করলেন, পূর্বানুমান করলেন এটি কোনদিকে মোড় নিতে পারে। ক্রেয়ল শীঘ্রই দেখলেন যে তার ভাই সবসময় অনুপস্থিত থাকেন না, যেমনটি তিনি পরবর্তী সময়ে বজায় রাখতেন, যখন মানুষজন প্যাসিস্থ বাড়ীর গেটে বৃথা কড়া নাড়তেন। এক তালামিস্ত্রীর শিক্ষানবিস তাকে অনেকগুলো চাবি বানিয়ে দেয়, তার মনিব Monsieur de M..এর জন্য যেগুলো বানিয়েছিল সেগুলোর মডেল অনুসারে। দশদিন বিরতির পর, ভয়ে তিক্তবিরক্ত হয়ে এবং উম্মাদ কল্পনাগুলো দিয়ে উৎপীড়িত হয়ে, ক্রেয়ল রাতে দেয়ালগুলো টপকালো, প্রধান আঙ্গিনার খেউড় ভেঙ্গে চূর্ণবিচূর্ণ করলো, মই দিয়ে ছাদে পৌঁছলো এবং নর্দমার নল পিছলে একটি ভাঁড়ার-ঘরের জানালার নিচে গেল। ভয়াবহ চিৎকার তাকে সহায়তা করলো অলক্ষিতে কাচের দরজা পর্যন্ত হামাগুড়ি দিয়ে যেতে। যা দেখলো তাতে তার মন ভেঙ্গে গেল। কুলুঙ্গিতে বাতির আলো জ্বলজ্বল করছিল। বিছানা-পর্দার পেছনে, অবিন্যস্থ চুল এবং ক্রোধে উম্মত্ত  রক্তিম মুখ। তার স্ত্রীর কাছাকাছি Monsieur de M..  অর্ধনগ্ন অবস্থায় বিছানার উপর গুটিশুটি মেরে আছে, যেটি সে ত্যাগ না করার সাহস দেখিয়েছিল, যদিও আধা-আধি তার নিকট থেকে ছিনিয়ে নেয়া হয়েছিল, সবথেকে তিক্ত ভৎর্সনা তার উপর স্তুপীকৃত হচ্ছিল এবং মনে হচ্ছিল যেন একটি বাঘ তাকে টুকরো টুকরো করতে প্রস্তুত। ‘হাঁ’, তিনি তাকে বললেন, ‘আমি কুৎসিত, আমি একজন দৈত্য এবং, আমি এটা খুবই ভালভাবে জানি, আমি তোমাকে আতঙ্কিত করতে উদ্বুদ্ধ করি। তুমি আমার থেকে মুক্ত হতে ইচ্ছা পোষণ কর যেনো আমাকে দেখতে পাওয়া তোমার জন্য বোঝা না হয়ে যায়। তুমি এমন একটি মুহুর্তেও প্রত্যাশা করছো যা তোমাকে মুক্ত করবে। এবং  আমাকে উল্টোটি বলো না, তোমার ভয় এবং তোমার প্রতিরোধে আমি তোমার ভাবনাগুলো অনুমান করি। আমি যে মূল্যহীন হাসির উদ্রেক করি তাতে তুমি আরক্তিম হও, তুমি অন্তর্গতভাবে আমার বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হও। তুমি নিঃসন্দেহে মিনিটগুলো হিসাব কর, এক এক করে,যেগুলো অবশ্যি অতিক্রান্ত হবে যে পর্যন্ত না আমি আর তোমাকে অবরুদ্ধ করি আমার দুবর্লতাগুলো এবং আমার উপস্থিতি দিয়ে। থামো! আমি ভয়ংকর ইচ্ছে, উম্মাদিত অভিলাষ দিয়ে অভিগ্রস্থ, তোমাকে আমার মত করে গড়তে, তোমাকে বিকৃত করতে, যাতে আমাকে জানার দুর্ভাগ্যের জন্য তুমি প্রেমিকদের সাথে নিজেকে প্রবোধ দিতে আর আশা না করতে পারো। আমি এই বাড়ীর সবগুলো আয়না ভেঙ্গে ফেলবো যাতে সেগুলো আমাকে বৈপরীত্য দিয়ে ভৎর্সনা না করে, যাতে তারা তোমার গর্বকে সযত্নে লালন না করতে পারে। সম্ভবত তোমাকে বাইরের দুনিয়াতে নিয়ে যাওয়া আমার উচিত, অথবা সেখানে তোমাকে আমার যেতে দেয়া দরকার, দেখাতে কীভাবে সবাই তোমাকে উৎসাহ দেয় আমাকে ঘৃণা করতে? না, না, তুমি আমাকে হত্যা না করা পর্যন্ত এই বাড়ী ত্যাগ করে যাবে না। আমাকে হত্যা কর, অনুমান কর আমি প্রতিদিন কি করতে প্রলুব্ধ হই!’ এবং জোর চিৎকার, তার দাঁত কিড়মিড় করা, মুখ ফেনিয়ে উঠা, পাগলামির হাজারটা লক্ষণসহ, এবং ক্রোধে নিজেকে আঘাত করা, এই হতভাগ্য নারীর নিকটে, যার কোমল প্রণয় স্পর্শ এবং সবথেকে করুণ সনির্বন্ধ অনুরোধ করার কোনো মানেই হয় না। অবশেষে সে তাকে শান্ত করলো। নিঃসন্দেহে, দরদ ভালোবাসাকে প্রতিস্থাপিত করেছিল, কিন্তু তা এ লোকটির জন্য যথেষ্ট ছিল না যে দেখতে খুব ভয়ংকর হয়েছিল, যার আবেগ এতটাই শক্তি ধারণ করেছিল। বিষন্নতার দীর্ঘ ব্যাপ্তির জের ছিলো এই দৃশ্য, যা এই ক্রেয়লকে ভয়ে অসাড় করেছিলো। সে কাঁপতে লাগলো এবং জানে না কার কাছে দৌঁড়াতে হবে এই ভয়াবহ নির্যাতন থেকে এই দুর্ভাগা নারীকে রক্ষা করতে। এই দৃশ্যের প্রতিদিন পুনরাবৃত্তি ঘটছিল, সেজন্য উত্তেজনার পর Madame de M…কে ঔষধের বোতলগুলোর নিকট শরণ নিতে হতো যেগুলো তৈরী করা হয়েছিল তার নির্যাতকের মৃদু শান্তি ফিরিয়ে আনতে।


“এ সময় প্যারিসে Madame de M… এর পরিবারের একমাত্র প্রতিনিধি ছিলো ক্রেয়ল। এ ক্ষেত্রে সর্বোপরি একজন যা চাইতে পারে তা হলো বিচারিক প্রক্রিয়ার ধীরগতিকে এবং আইনের উদাসীনতাকে অভিশাপ দেওয়া, যেগুলোকে কেউ সরাতে পারে না তাদের সুন্দরভাবে সাজানো রুটিন থেকে, বিশেষ করে যখন এটি কেবলমাত্র একটি নারীর প্রসঙ্গে, যে সত্তাটিকে আইন প্রণেতাগণ সবচেয়ে কম নিশ্চয়তা দিয়ে থাকে। একটি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, কিছু কঠোর পদক্ষেপ এককভাবে বিপর্যয়কে প্রতিরোধ করতে পারতো। এই উম্মাদনার স্বাক্ষী বিপর্যয়টি পুর্বানুমান করতে পাচ্ছিল। যাহোক, তার নিজের ওপর সকল পরিণাম নিতে সে সব ঝুঁকি নিতে এবং যেকোনো ঝুঁকির জন্য সংশ্লিষ্ট দায়িত্ব নিতে ভয় না পাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। ইতোমধ্যে তার বন্ধুদের মধ্য থেকে কিছু ডাক্তার তার মত দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হলো Madame de M…এর বাড়ীতে প্রবেশাধিকার পেতে প্রস্তুতি নিতে যাতে পাগলামির প্রকোপগুলোর বৈশিষ্ট্য নিরূপণ করা যায় এবং সরাসরি জোর করে স্বামী-স্ত্রীকে পৃথক করা যায়, যখন আত্মহত্যার ঘটনাটা বিলম্বে নেয়া প্রস্তুতিসমূহের নায্যতা প্রতিপাদন করে এবং সমস্যার অবসান ঘটায়।


“নিশ্চিতভাবে, যারা বাক্যসমূহের সামগ্রিক অন্তর্নিহিত অর্থকে আক্ষরিক অর্থে দেখে না, তাদের জন্য এই আত্মহত্যা ছিলো স্বামী কর্তৃক সংঘটিত একটি বিশ্বাসঘাতক খুন; কিন্তু এটা ছিলো ঈর্ষার একটি ব্যতিক্রমী প্রকোপের ফলাফল। ঈর্ষান্বিত ব্যক্তির একজন দাস দরকার, ঈর্ষান্বিত ব্যক্তি ভালোবাসতে পারে, কিন্তু যে ভালোবাসা সে অনুভব করে তা ঈর্ষার জন্য কেবলমাত্র একটি বিলাসী প্রতিমূর্তি; ঈর্ষান্বিত ব্যক্তি সর্বোপরি একজন ব্যক্তিগত সম্পত্তি-মালিক। [এই বাক্যটি মার্কস নিয়েছিলেন পিউশে কর্তৃক দেয়া আত্মহত্যার আর একটি মামলার বর্ণনা থেকে ((cf. t. IV, p. 159)।] অর্থহীন ও বিপদজনক কলংক তৈরী করা থেকে আমি ক্রেয়লকে নিবৃত্ত করলাম, তার ভালবাসার জনের স্মৃতির প্রতি সর্বোপরি যা ছিলো বিপদজনক, কারণ অলস জনতা উপদ্রুতকে অভিযুক্ত করতো তার স্বামীর ভাইয়ের সাথে ব্যভিচারী সম্পর্কের জন্য। আমি শেষকৃত্য প্রত্যক্ষ করলাম। ভাইটি ও আমি নিজে ছাড়া আর কেউ সত্য জানতো না। আমাদের চারপাশে আমি নিন্দনীয় গুঞ্জণ শুনতে পেলাম এই আত্মহত্যা সম্পর্কে এবং আমি সেগুলো অবজ্ঞাভরে পরিহার করলাম। একজন আরক্তিম হয় জন-অভিমতের জন্য যখন একজন এটি কাছ থেকে দেখে, এর কাপরুষোচিত তিক্ততা এবং এর নোংরা বক্রোক্তিসহ।



অভিমত খুবই বিভক্ত জনগণের বিচ্ছিন্নতা দিয়ে, খুবই অজ্ঞ, খুবই বিকৃত, কারণ প্রত্যেকে তার নিজের নিকট আগন্তুক এবং সবাই একে অপরের নিকট আগন্তুক। [শেষ বাক্যটি মার্কস নিয়েছেন পিউশের নিচে দেয়া আত্মহত্যার আর একটি মামলার বর্ণনা থেকে (cf. t. IV, p. 167), মার্কস মুক্ত তরজমা দেন এবং উপসংহারমূলক বাক্যটি যোগ করেন: “কারণ প্রত্যেকে তার নিজের নিকট আগন্তুক এবং সবাই একে অপরের নিকট আগন্তুক।”] “অকস্মাৎ, একই ধরনের ঘটনার  অধিকতর উম্মোচন ছাড়াই কয়েক সপ্তাহ কেটে গেল। একই বছরে আমি নিবন্ধিত করি ভালোবাসার আর একটি ঘটনা যা তাদের পিতামাতার অনুমোদনের অস্বীকৃতিতে দু’টি পিস্তলের গুলিতে সমাপ্ত হয়।


“যে সমস্ত মানুষের দুনিয়া তাদের বিকাশমান বয়সে পুরুষত্বহীনতায় পর্যবসিত হয়, আমি তাদের আত্মহত্যা নথিভুক্ত করেছিলাম। রমণের অপব্যবহার এদেরকে স্থায়ী বিষাদময়তায় নিক্ষেপ করেছিলো।


“ক্ষতিকর প্রেসক্রিপসন দিয়ে দীর্ঘ ও বেহুদা অত্যাচারের পরে অনেক মানুষ তাদের দিনগুলো শেষ করে এই বিশ্বাস দিয়ে যে ঔষধপত্র তাদেরকে রোগ-বালাই থেকে মুক্ত করতে অক্ষম।”


“বিখ্যাত লেখকদের উদ্ধৃতিসমূহ এবং কবিতাগুলোর একটি উল্লেখযোগ্য সংগ্রহ তৈরী করা যেতে পারে, কিছু আড়ম্বরসহ তাদের মৃত্যুর প্রস্তুতির জন্য এগুলো হতাশাগ্রস্থ লোকজনদের লেখা। বিস্ময়করভাবে ঠান্ডা মাথার মুহুর্তের সময় মৃত্যুর সিদ্ধান্তটি আসে, এক ধরনের সংক্রমণমূলক ঝোঁক উৎসারিত হয় এই সমস্ত আত্মা থেকে এবং কাগজের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়, এমনকি সেই সমস্ত শ্রেণীর মধ্যে যারা সকল শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। যখন তারা এগুলো রচনা করে আত্মত্যাগের জন্য, তাতে তারা যে গভীরতা আরোপ করে, তাদের সকল শক্তি এমনভাবে ঘণীভূত হয় যেনো তা বেরিয়ে আসে উষ্ণ ও বৈশিষ্টায়িত অভিব্যক্তিতে।


“আর্কাইভে চাপা পরা এই কবিতাগুলোর কিছু হলো মাস্টারপিস। একজন ওজনদার বুর্জোয়া, যে তার আত্মাকে ব্যবসায় এবং তার ঈশ্বরকে বানিজ্যে নিয়োজিত করে, সে এই সবকিছু রোমান্টিক দেখে এবং যে কষ্ট সে উপলব্ধি করে না তা তার অবজ্ঞাপূর্ণ হাসি দিয়ে অস্বীকার করে। তার অবজ্ঞা আমাদের বিস্মিত করে না।”


তিন পারসেন্টের কুসীদজীবিদের কাছ থেকে একজন কীইবা আশা করতে পারে, যে এমনকি ধারণা করতে পারে না যে দৈনিক, ঘন্টায় ঘন্টায়, খন্ড খন্ডভাবে, তারা নিজেদের, তাদের মানব স্বভাব হত্যা করছে!


অধিকন্তু, এই সমস্ত হতভাগ্য লোকদের মাঝে আত্মার সন্দেহাতীত মহানুভবতা অবশ্যি বিদ্যমান, যারা মৃত্যুকে বরণ করতে, নিজেদের ধ্বংস করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ এবং উঁচু মাচান থেকে ফাঁসি দিয়ে আত্মহত্যার পথ নেয়নি। এটা সত্যি যে, আমাদের বানিজ্যিক যুগের যত উন্নতি হবে, দুঃখের এই মহৎ আত্মহত্যাগুলো দুর্লভ হবে। সচেতন শত্রুতা সেগুলোর জায়গা নেবে, এবং নিঃস্ব কেউ কেউ অবিবেচকরূপে চুরি ও খুনের দিকে ধাবিত হয়। কাজ পাওয়ার চেয়ে মৃত্যু দন্ড পাওয়া অধিকতর সহজ।


“পুলিশের আর্কাইভ তন্ন তন্ন করে খুজে আমি হঠাৎ আত্মহত্যার তালিকাতে কাপুরুষতার একটি মাত্র মামলা দেখতে পাই। সে ছিল তরুণ আমেরিকান, উইলফ্রিড র‌্যামজে। তিনি ডুয়েল থেকে অব্যাহতি পেতে নিজেকে হত্যা করেন।




“আত্মহত্যার নানা কারনের শ্রেণীকরণ হবে খোদ আমাদের সমাজের ক্রটিসমূহের শ্রেণীকরণ দিয়ে। কোনো একজন দীর্ঘ বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানে নিজেকে নিয়োজিত রেখে আবিষ্কার করেন। চক্রান্তকারীরা তার আবিষ্কার ছিনতাই করে, এই ঘটনায় আবিষ্কারক নিক্ষিপ্ত হন ভয়াবহ দারিদ্রে, তিনি নিজে এমনকি একটি পেটেন্ট কেনার অবস্থায় থাকেননা,তাই তিনি নিজেকে হত্যা করেন। আর্থিক দেনাগ্রস্ত অবস্থার ফলে বিপুল ব্যয় এবং অবক্ষয়িত আইনি লড়াই (legal prosecution) পরিহার করতে আর একজন  নিজেকে হত্যা করেন, এগুলো খুবই সাধারণ ঘটনা, কারণ সাধারণ কুসিদজীবিতা পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিগণও এ সম্পর্কে আদৌ উদ্বিগ্ন নন। আমাদের মধ্যে যারা কাজের স্বেচ্ছাচারী বিতরণকারী তাদের অপমান ও কঞ্জুসতার অধীনে তার দিনের জন্য গভীর আর্তনাদের আর একজন আবার নিজেকে হত্যা করে কারণ সে কাজ খুঁজে পাচ্ছিল না। [...]

“একদিন এক ডাক্তার আমার সাথে একটি মৃত্যু সম্পর্কে আলোচনা করে। এই মৃত্যুর কারণের জন্য সে নিজেকে অভিযুক্ত করে।

“এক সন্ধ্যায়, বেলিভিলে ফেরার সময়, যেখানে তিনি বাস করতেন, অন্ধকারে একজন অবগুন্ঠিত নারী কর্তৃক তিনি পথরুদ্ধ হন একটি সংকীর্ণ রাস্তায়, যেটি থেকে একটু দূরে তার বাড়ী অবস্থিত ছিল। সে কম্পিত স্বরে তার নিকট প্রার্থনা করলো তার কথার শোনার জন্য। কিছু দূরে একটি লোক বিক্ষিপ্তভাবে হাটছিল, সে তার চেহারা ঠাহর করতে পারেনি। এই লোকটি নারীটিকে পর্যবেক্ষণ করছিল। ‘স্যার’, সে ডাক্তারকে বললো, ‘আমি অন্তঃসত্তা, এবং যখন এটা জানাজানা হবে, আমি তখন নিন্দিত হবো। আমার পরিবার, জন-অভিমত, সম্মানিত মানুষজন আমাকে ক্ষমা করবে না। যে নারীর আস্থায় আমি বিশ্বাসঘাতকতা করেছি, সে তার যুক্তি হারাতো, এবং নিঃসন্দেহে সে তার স্বামীকে তালাক দিতো। আমি আমার ঘটনার পক্ষ সমর্থন করছি না। আমি একটা কেলেংকারির কেন্দ্রে যেটি কেবলমাত্র আমার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হতে ব্যহত হবে। আমি নিজেকে হত্যা করতে চাই, জনগণ আমাকে বাঁচিয়ে রাখতে চায়। আমাকে বলা হয় যে তোমার সমবেদনা আছে, এবং এটি আমাকে প্রনোদিত করে যে একটি শিশু হত্যায় আামি সহযোগী হতে চাইবো না, এমনকি এই শিশুটি যদি দুনিয়াতে এসে নাও থাকে। আপনারা দেখতে পাচ্ছেন এটা গর্ভপাতের প্রশ্ন। আমি নিজেকে অবমূল্যায়িত করবো না কোনো কিছুর জন্য দন্ড লঘুকরণে ওকালতি করতে , যা আমি বিবেচনা করি সবচেয়ে তিরস্কারযোগ্য অপরাধ হিসেবে। নিজেকে আপনার নিকট উপস্থাপন করতে গিয়ে আমি কেবলমাত্র অন্যদের আরজি জোগান দিয়েছি। যেহেতু কীভাবে মরতে হবে তা আমাকে জানতে হবে। আমি মৃত্যুকে নিজেই ডেকে আনবো, এবং তার জন্য আমার কাউকে দরকার নেই। একজন বাগানে পানি দিয়ে আনন্দ খুঁজে পাওয়ার ভান করতে পারেন। একজন এর জন্য কাঠের খরম পড়তে পারেন। একজন একটি পিচ্ছিল জায়গা পছন্দ করতে পারেন যেখানে তিনি প্রতিদিন পানি নিয়ে ব্যস্ত থাকতে পারেন। একজন কূপের গভীরে অদৃশ্য হওয়ার ব্যবস্থা করতে পারেন। এবং মানুষজন বলবে যে এটা ছিলো একটি ‘দুর্ঘটনা’। আমি আগে থেকেই সব জেনেছি, জনাব। আমার আশা এটা হতে পারতো সকাল পর, আমি যেতে চাই আমার সম্পূর্ণ হৃদয় দিয়ে। সবকিছু তৈরী করা হয়েছে যেন এটা ঘটবে সেভাবেই। আমাকে বলা হয়েছে এটা তোমাকে বলতে, এবং আমি তাই করেছি। আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে একটি হত্যাকান্ড সংঘটিত হবে না দু’টি হবে। আমার কাপুরুষতার কারণে আমাকে দিব্যি দিতে হয়েছিল যে আমি আপনার সিদ্ধান্ত মানবো কোনোরকম আপত্তি ছাড়া। সিদ্ধান্ত নিন!

ডাক্তার বলে চললেন, ‘এই পছন্দ আমাকে সন্ত্রাসিত করে। এই নারীর কন্ঠস্বরে ছিল একটি খাঁটি ও সুরেলা ধ্বনি; তার যে হাত আমি ধরেছিলাম, তা ছিল সুন্দর ও কমনীয়। তার অকপট ও নির্ধারিত হতাশা পূর্বাভাস দেয় চমৎকার সাহসিকতার। কিন্তু ইস্যুটিতে একটি বিষয় ছিল  যা আমাকে বাস্তবিকই নাড়া দেয়; যদিও হাজারটা ক্ষেত্রে, উদাহরণস্বরূপ, কষ্টকর প্রসবে, যখন সার্জনকে বেছে নিতে হয় মা অথবা শিশুর যেকোন একজনকে রক্ষা করতে, তখন রাজনীতি অথবা মানবতা স্বেচ্ছায় সিদ্ধান্ত নেয়, কোন দ্বিধা ছাড়াই।’

আমি বললাম, “বিদেশে পালিয়ে যাও’। সে উত্তর দিল, ‘অসম্ভব’, ‘এটা এই জন্য নয় যে সে প্রত্যাশা করবে না।’

“যথাযথ সর্তকতা নাও।’

“আমি পারি না, একই নির্ভৃত কক্ষে থাকতে যে নারীর বন্ধুত্বের প্রতি আমি বিশ্বাসঘাতকতা করেছি।’ ‘সে আপনার আত্মীয়?’ ‘আমি অবশ্যি আপনাকে আর কিছু বলবো না।’

ডাক্তার বলে চললেন, “‘এই নারীকে আত্মহত্যা অথবা অপরাধ থেকে রক্ষা করতে আমি আমর হৃদয়ের রক্ত দিয়ে দিতে পারতাম, অথবা, এটা হতে পারতো যে তিনি এই সংঘাত পরিহার করতে পারতেন আমার প্রয়োজন ছাড়া। আমি নিজেকে বর্বরতা দিয়ে অভিযুক্ত করি কারণ হত্যাকান্ডে সহযোগিতা হতে আমি সংকুচিত হই। সংগ্রামটি ছিল ভয়াবহ। তখন একটি দানব চুপিসারে আমাকে বললো যে একজন মারা যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেই নিজেকে হত্যা করতে পারে না; ঐ আপোসী মানুষজনকে বাধ্য করা যেতে পারে তাদেও কদভ্যাস পরিত্যাগ করতে যদি তাদের অশুভ করার ক্ষমতা তাদের কাছ থেকে কেড়ে নেয়া হয়। আমি  বিলাসিতা অনুমান করতে পারি তার সূচিকর্ম থেকে, তার আঙ্গুলগুলো যা দিয়ে খেলছিল, এবং তার বক্তৃতার মার্জিত বাগবিন্যাস থেকে সম্পদের উৎসগুলো অনুমান করতে পারি। আমরা বিশ্বাস করি যে ধনীদের প্রতি আমরা কম মমতা অনুভব করি; আমার আত্ম-মর্যদাবোধ স্বর্ণ দিয়ে প্রলোভিত চিন্তাভাবনার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল, যদিও তখন পর্যন্ত এই বিষয়টি স্পর্শ করা হয়নি, যা ভদ্রতার আরেকটি চিহ্ন এবং প্রমাণ করে যে আমার চরিত্রকে সম্মান দেয়া হচ্ছিলো। আমার উত্তর ছিলো একটি প্রত্যাখ্যান; মহিলা দ্রুত চলে গেলেন; ক্যাব্রিলেই (cabriolet, এক প্রকারের এক্কাগাড়ি)-এর শব্দ আমার এই উপলব্ধি ঘটায় যে যা করেছি তা থেকে পরিত্রাণ পেতে আমি অসমর্থ।

‘এক পক্ষকাল পরে একটি সংবাদপত্র আমাকে রহস্য, মিথ্যার সমাধান দিলো। একজন প্যারিস ব্যাংকারের তরুণী ভাইঝি, খুব বেশী হলে বয়স ১৮ হবে, সে তার চাচীর খুব প্রিয় প্রতিপাল্য ছিলো। তার মায়ের মৃত্যুর তিনি মেয়েটিকে তার দৃষ্টির বাইরে যেতে দিতেন না। সে ভিলমোম্বলে (Villemomble)) অবস্থিত তার অভিভাবকদের এস্টেটের একটা ছোট্ট নদীতে (a brook) পিছলে পড়ে ডুবে গেল। তার অভিভাবক শোকে পীড়িত। মেয়েটির চাচার ক্ষমতাতে ভিরু প্রলুব্ধকারী (seducer) দুনিয়ার সামনে অনুশোচনা প্রকাশ করতে পারতো।

একজন উপলব্ধি করে যে কোনো ভালোকিছুর অভাবের জন্য, ব্যক্তিগত জীবনের দুর্ভাগ্যের বিপরীতে আত্মহত্যা চরম অবলম্বন।

আত্মহত্যার কারণগুলোর মধ্যে আমি প্রায়ই দেখি অফিস থেকে কর্মচ্যুতি, কাজের প্রত্যাখ্যান, অথবা হঠাৎ বেতন হ্রাস, যার ফলে পরিবারগুলো জীবন-ধারণের উপকরণ, আরও কিছু ক্রয় করতে পারে না, যেহেতু তাদের অধিকাংশ দিন আনে দিন খায়।

“যখন রাজকীয় প্রাসাদে প্রহরীদের সংখ্যা কমানো হয়, তখন একজন ভাল মানুষকেও অন্যদের মত বরখাস্ত করা হয় আর কোন কর্মব্যস্ততা ছাড়াই। তার বয়স এবং তার প্রভাবের ঘাটতি তার জন্য অসম্ভব হয়ে যায় সেনাবাহিনীতে ফিরে যাওয়া; কল-কারখানার দরজাও বন্ধ তার জ্ঞানের অভাবের জন্য। সে সিভিল সার্ভিসে প্রবেশের চেষ্টা করে; সবজায়গার মত এখানেও অসংখ্য প্রতিযোগী তার সামনে দাঁড়িয়ে। সে তমসাবৃত হতাশায় নিমজ্জিত হয় এবং নিজেকে হত্যা করে। একটি চিঠি এবং তার পরিস্থিতি  সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায় তার পকেটে। তার স্ত্রী একজন দরিদ্র দর্জি; ১৬ ও ১৮ বছর বয়সী দুটি কন্যা তার সাথে কাজ করে। আমাদের আত্মহত্যাকারী তারনাও (Tarnau) কাগজে লিখে গেছে যে, ‘যেহেতু তাকে আর তার পরিবারে কোনো কাজে লাগবে না এবং তার স্ত্রী ও সন্তানদের জন্য সে বোঝা হতে বাধ্য, তাই সে বিবেচনা করে যে জীবন নিয়ে নেয়া তার দায়িত্ব যাতে এই বাড়তি বোঝা থেকে তারা নিষ্কৃতি পায়। সে তার সন্তানদের ডাচেস অব এ্যঙ্গৌলিমের (Duchess of Angoulême) নিকট সুপারিশ করে; সে আশা করে যে  এই প্রিন্সেস তার উদারতা দিয়ে এত ব্যাপক দুর্দশায় সহানুভূতি দেখাবেন।’ আমি পুলিশ প্রিফেক্ট এ্যঙ্গলিসের (Anglès) নিকট রিপোর্ট দেই, এবং যখন দরকারী আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয় ডাচেস দুর্ভাগা তারনাও পরিবারকে ৬০০ ফ্রাঙ্ক পাঠিয়ে দেয়।

“এ ধরনের ক্ষতির পর, বাস্তবিকই দুঃখজনক সাহায্য। কিন্তু একটি পরিবার কীভাবে সকল দুর্ভাগা পরিবারকে সহায়তা করবে, যেহেতু যখন সবকিছু বিবেচনায় নেয়া হবে, সমগ্র ফ্রান্স এর বর্তমান অবস্থায় তাদের প্রতিপালন করতে পারবে না। ধনীদের হিতৈষীতাও পর্যাপ্ত হবে না যদি এমনকি আমাদের সমগ্র জাতি ধার্মিক হয়ে যায়, যা ঘটনা থেকে দূরে। আত্মহত্যা সবচেয়ে কঠিন সমস্যার সমাধান করে, অন্যদের মাচায় তুলে। আয় ও প্রকৃত সম্পদের উৎসসমূহ প্রত্যাশা করা যেতে পারে কেবল আমাদের কৃষি ও শিল্পের সার্বিক সিস্টেমের পুনর্গঠন করে। কাগজে সংবিধান ঘোষণা করা সহজ, শিক্ষায় ও কাজে প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার, এবং সর্বোপরি বেঁচে থাকার ন্যুনতম উপায়ের অধিকার। কিন্তু কাগজে এই সব মহৎ ইচ্ছা লেখাই যথেষ্ট নয়, সঠিক কাজ হলো এই উদারনৈতিক ধারণাগুলো বস্তুগত ও বুদ্ধিবৃত্তিক [সামাজিক] প্রতিষ্ঠানসহ ফলপ্রসু করা।

উদ্দীপ্ত দুনিয়া, প্যাগানবাদ পৃথিবীতে চমৎকার সব উদ্ধাবন তুলে ধরে; আধুনিক মুক্তি কি তার প্রতিদ্বন্দ্বীর পেছনে পেছনে চলবে? শক্তির এই দু’টি চমৎকার উপাদানকে কে একত্রে গ্রন্থিত করবে?”

এই পর্যন্ত পিউশে।

উপসংহারে আমরা প্যারিসে বার্ষিক আত্মহত্যার ওপর তার টেবিলগুলোর একটি দেবো [পিউশে সাইন বিভাগে (the Seine Department) লেখেন।]

পিউশের দেয়া টেবিলগুলোর আর একটি থেকে আমরা জানতে পারি যে ১৮১৭ থেকে ১৮২৪ (সমেত) পর্যন্ত প্যারিসে ২,৮০৮টি আত্মহত্যা সংঘটিত হয়। প্রকৃতপক্ষে, অবশ্যি, সংখ্যাটি আরো বেশী। বিশেষ করে, নিমজ্জিত ব্যক্তিগণ যাদের দেহ মর্গে রাখা থাকে তাদের প্রসঙ্গে খুব বিরল ক্ষেত্রেই জানা যায় যে তারা আত্মহত্যা করেছে কিনা।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পরকীকরণ: মার্কসের তত্ত্বের ভূমিকা

ক্রিস্টাল ফিল্ড তত্ত্ব স ম আজাদ

পণ্যপুঁজা: যুডি কক্স