বিজ্ঞানীর নৈতিক দায় মূল: কার্ল সাগান অনুবাদ: স ম আজাদ
বিজ্ঞানীর নৈতিক দায়
মূল: কার্ল সাগান অনুবাদ: স ম আজাদ
[লেখক পরিচিতি: ড. কার্ল সাগান যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ে Astronomy and Space Sciences-এর ডেভিড ডানকান অধ্যাপক ছিলেন। ক্যালিফোর্নিয়া ইনন্টিটিউট অব টেকনোলজিতে জেট প্রোপালসন ল্যাবরেটরিতে ভিজিটিং বিজ্ঞানী ছিলেন। এছাড়া তিনি প্ল্যানেটরি সোসাইটির সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি ছিলেন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২২টি সম্মানসূচক ডিগ্রী অর্জন করেন তাঁর কর্মের স্বীকৃতি হিসেবে।
পুলিৎজার পুরস্কার বিজয়ী ড. সাগান অনেক বেস্ট সেলার বইয়ের লেখক। এগুলোর মধ্যে Cosmos অন্যতম একটি গ্রন্হ। এটি ইংরেজী ভাষায় লিখিত সবচেয়ে বহুল পঠিত জনপ্রিয় বিজ্ঞান বই। তাঁর অন্যান্য পুস্তকগুলোর মধ্যে Intelligent Life in the Universe, The Dragon of Eden, Broca's Brain, Comet, A Path Where no man Thought: Nuclear Winter and The End of Arms Race, Pale Blue Dot: A Vision of the Human Future ইত্যাদি উল্লেখ্য।
বর্তমান প্রবন্ধ ‘বিজ্ঞানীর নৈতিক দায়’ নেয়া হয়েছে তাঁর একটি গ্রন্থ ‘The Demon-Hounted World, Science as a Candle in the Dark' থেকে। এটি নিউইয়র্ক টাইমসের বেস্ট সেলার গ্রন্থ ছিল। নিবন্ধটির মূল শিরোনাম ‘When Scientists know Sin' । তিনি দেখিয়েছেন যে আবিষ্কৃত ভয়ংকর শক্তির অপব্যবহারের দায়-দায়িত্ব রাজনীতিকদের স্কন্ধে চাপিয়ে দিয়ে বিজ্ঞানী দায়মুক্ত থাকতে পারেন না। নিউক্লিয় শক্তির অপব্যবহার রোধে শেষ পর্যন্ত তিনি শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্র, মুক্ত মিডিয়া, তরুণ-তরুণী, নারী ও শিশুর ওপর ভরসা করেছেন। তাঁর অতি মহৎ ভাবনা যে পারমাণবিক তীর শেষ পর্যন্ত উৎপাটিত হবে নারী ও শিশুর দ্বারা। এই মহঃ বিজ্ঞানী ও দার্শনিক১৯৯৬-এর ২০ ডিসেম্বর মৃত্যু বরণ করেন।]
প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস. ট্রুম্যানের সাথে যুদ্ধোত্তর বৈঠকে Manhattan Nuclear Weapons Project-এর বৈজ্ঞানিক পরিচালক রবার্ট জে. ওপেনহাইমার শোকার্তভাবে মন্তব্য করেন যে বিজ্ঞানীদের হাত রক্তে রঞ্জিত; তাঁরা পাপ সম্পর্কে এখন অবগত। ট্রুম্যান তাঁর সহকারীকে নির্দেশ দেন যে তিনি কোনো দিনই আর ওপেনহাইমারকে দেখতে চান না। বিজ্ঞানীরা কখনও অপকর্মের জন্য নিন্দিত হন এবং কখনও বিজ্ঞানের অপব্যবহার সম্পর্কে সতর্ক করার জন্য ভৎর্সিত হন।
সর্বোপরি বিজ্ঞান পেশা হিসেবে গৃহিত হয়, কারণ বিজ্ঞান এবং এর আবিষ্কারকে নৈতিকভাবে নিরপেক্ষ ও দ্ব্যর্থক ধরা হয়; এছাড়া একে সহজেই ভাল ও মন্দ উভয় কর্মেই নিয়োজিত করা যায়। এটি একটি পুরনো মতবাদ। সম্ভবত আগুনের গার্হস্থ্য ব্যবহার এবং পাথর টুকরা করার যন্ত্র আবিষ্কারের সময় থেকেই এ মতবাদটি চলে এসেছে। প্রযুক্তি আদি মানবের পূর্ব হতে আমাদের পুরুষাণুক্রমিক ধারার (ancestral line) সাথে রয়েছে। আমরা প্রযুক্তিগত প্রজাতি, এ সমস্যা কেবলমাত্র মনুষ্য স্বভাবের সাথে সম্পর্কিত নয়, এটি বিজ্ঞানের সাথেও সম্পর্কিত বটে। এ দ্বারা আমি বুঝাতে চাই না যে বিজ্ঞানের কোনও দায়বদ্ধতা নেই তার আবিষ্কারের অপব্যবহারের জন্য। এর নিগূঢ় দায়িত্ব রয়েছে, এবং বিজ্ঞানের আবিষ্কার যত শক্তিশালী হয় ততই এর দায়িত্ব বেড়ে যায়।
মারণাস্ত্র ও মার্কেট ডিরাইভেটিভসের ন্যায় যে-প্রযুক্তি আমাদর বেঁচে থাকার মান বৃদ্ধি করে বিশ্ব-পরিবেশের পরিবর্তন ঘটায় তার ব্যবহারে সাবধানতা বিচক্ষণতা অবলম্বন জরুরী। হ্যাঁ, এটি সেই আদি মানব জাতি যে সর্বদাই প্রযুক্তির উদ্ভাবন করে। হ্যাঁ, আমরা বরাবরের মতই নিত্য নতুন প্রযুক্তির বিকাশে তৎপর। কিন্তু যখন গ্রহীয় মাত্রায় (in plenetary scale) ক্ষতি সাধনের অভূতপূর্ব ক্ষমতাসম্পন্ন শক্তির সাথে আমরা মৈত্রী বন্ধনে আবদ্ধ হই, তখন আমাদের অধিকতর জরুরী কিছু দরকার- একটি বিকাশমান নৈতিক মূল্যবোধ যা অভূতপূর্বভাবে গ্রহীয় মাত্রায় প্রতিষ্ঠিত হতে হবে।
বিজ্ঞানী কখনও দু'ভাবে এটি পেতে চেষ্টা করে: যে-বৈজ্ঞানিক প্রয়োগ আমাদের জীবনক সমৃদ্ধ করে বিজ্ঞানী তাঁর কৃতিত্ব নেন কিন্তু যে বৈজ্ঞানিক গবেষণা থেকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে অথবা আকস্মিকভাবে মারণ যন্ত্রের (Instrument of death) উদ্ভাবন হয় তার দায়ভাগ থেকে নিজেদের সরিয়ে রাখে। অস্ট্রেলীয় দার্শনিক জন প্যাসমোর (John Passmore) তাঁর `Science and its critics' গ্রন্থে লিখেছেন: Spanish Inquisition সরাসরি পুড়িয়ে হত্যাযজ্ঞের দায়বদ্ধতা এড়ানোর লক্ষ্যে ভিন্ন মতাবলম্বীদের স্বদহনে বাধ্য করতো। এরা ব্যাখ্যা দিতো- সরাসরি কাউকে হত্যা খ্রিস্টীয় নীতি-আদর্শের পরিপন্থী। এতে আমরা স্বল্পসংখ্যকই বলতে পারবো যে Inquisition খুনোখুনির দায় মুক্ত; এরা পরিণতি সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত ছিল। একইভাবে নার্ভ গ্যাস নিয়ে গবেষণারত বিজ্ঞানীর নিকট এ আবিষ্কারের প্রযুক্তিগত প্রয়োগ স্পষ্ট ও নির্ধারিত, এ অবস্থায় নার্ভ গ্যাসের সাহায্যে পঙ্গুকরণ বা হত্যার জন্য কেবলমাত্র সামরিক শক্তি দায়ী, বিজ্ঞানী দায়ী নয় বলে তিনি সত্যিকার অর্থে দাবী করতেপারেন না। তহবিলের বিনিময়ে বিজ্ঞানীর সোৎসাহে সরকারের প্রতি সহযোগিতার হস্ত প্রসারণে এটি আরো অবধারিত। যদি একজন বিজ্ঞানী বা দার্শনিক নৌ গবেষণা কার্যালয়ের মতো সংস্থা থেকে অর্থ গ্রহণ করেন, তখন তিনি প্রতারণা করেন যদি তিনি ভাবেন যে তাঁর কর্ম তাদের নিকট নিষ্প্রয়োজনীয়। কিন্তু ফলাফলের দায়ভার অবশ্যই তাঁকে নিতে হবে, যে ক্ষেত্রে তিনি জানেন যে এটি দরকারি। তাঁর গবেষণা কর্ম থেকে উদ্ভূত যে-কোনো আবিষ্কারের জন্য প্রশংসা বা নিন্দার ক্ষেত্রে তিনি বিষয়ী, নিঃসন্দেহে বিষয়ী (subjective)।
হাঙ্গেরীয় বংশোদ্ভূত পদার্থ বিজ্ঞানী এডওয়ার্ড টেলার-এর (Edward Teller) কর্মময় জীবনকে কেইস হিস্টোরি হিসেবে নেয়া যেতে পারে। তরুণ বয়সে হাঙ্গেরীতে বেলা কুন (Bela Kuhn) কমিউনিস্ট বিপ্লবের সময় এডওয়ার্ড টেলার সন্দেহ সংযুক্ত হন। এই সময়ে তাঁর মতো মধ্যবিত্ত পরিবারের সম্পত্তি ছিনিয়ে নেয়া হয়। রাজপথে কার দুর্ঘটনায় পায়ের অংশ বিশেষ হারিয়ে তিনি স্থায়ী দুর্গতির মধ্যে নিপতিত হন। প্রথম দিকে তাঁর অবদানের ব্যাপ্তি ছিল Quantum Mechanical Selection Rule ও Solid State Physics থেকে Cosmology পর্যন্ত। ১৯৩৯-এর জুলাই মাসে লংগ আইল্যান্ডে আলবার্ট আইনস্টাইন অবকাশ যাপন করছিলেন। এ সময়ে টেলার পদার্থবিজ্ঞানী শিলার্ডকে (Szilard) অবকাশরত আইনস্টাইনের নিকট মটরগাড়ি যোগে নিয়ে যান। এ বিজ্ঞানীত্রয়ের বৈঠকই প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাংকলিন রুজভেল্টের নিকট আইনস্টাইনের ঐতিহাসিক চিঠি প্রেরণের অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল। নাজী জার্মানীতে বৈজ্ঞানিক ও রাজনৈতিক উভয় ঘটনাবলীর প্রেক্ষাপটে তিনি এ চিঠিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ফিসন (Fission) বা ‘পরমাণু বোমা’ উদ্ভাবনের জন্য আহ্বান জানান। ম্যানহাটানে প্রকল্পে কাজ করবার জন্য মনোনীত হয়ে টেলার লস এলামসে (Los Alamos) এসে ত্বরিত সহযোগিতাদানে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেন, কারণ এই নয় যে তিনি পরমাণু বোমার ধ্বংসযজ্ঞের ক্ষমতায় অনুৎসাহ বোধ করছিলেন, বরং বিপরীত ধারণাই সত্যি। কারণ তিনি অধিকতর ধ্বংসযজ্ঞের ক্ষমতাসম্পন্ন মারণাস্ত্র ফিউসন বা তাপ-নিউক্লিয়ার বা হাইড্রোজেন বোমার ওপর কাজ করতে চেয়েছিলেন। (পরমাণু বোমার ধ্বংসাত্মক শক্তি উৎপাদনের ব্যবহারিক উচ্চ সীমা রয়েছে, হাইড্রোজেন বোমার ক্ষেত্রে এরূপ কোনো সীমা নেই। কিন্তু হাইড্রোজেন বোমার জন্য পরমাণু বোমা প্রয়োজন হয় ট্রিগার হিসেবে।)
ফিসন বোমা আবিষ্কার এবং জার্মানী ও জাপানের আত্মসমর্পণের পর যুদ্ধ শেষ হলো। কিন্তু টেলার রয়ে গেলেন ‘পরা’ (The Super)-এর দৃঢ় সমর্থক। স্তালিনের নেতৃত্বে কঠোর সামরিকায়িত সোভিয়েত ইউনিয়নের পুনর্গঠন সম্পর্কে উদ্বেগ এবং যুক্তরাষ্ট্রে McCarthyism-এর মতন মানসিক বৈকল্য টেলারের পথকে সহজ করেছিল। ওপেনহাইমার যুদ্ধোত্তর পরমাণু শক্তি কমিশনের জেনারেল এডভাইজরি কমিটির সভাপতি হয়েছিলেন, যদিও তাঁর চরিত্রে দৃঢ় কালিমা লেপন করা হয়েছিল। সরকারের শুনানিতে টেলার ছিদ্রান্বেষী সাক্ষ্য প্রমাণ সরবরাহ করেছিলেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ওপেনহাইমারের আনুগত্য সম্পর্কে প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলেন। সাধারণভাবে ধারণা করা হয় যে টেলারের সংশ্লিষ্টতাই এ ফলাফলের পেছনে নিয়ামক ভূমিকা পালন করেছিল। যদিও রিভিউ বোর্ড ওপেনহাইমারের আনুগত্য সম্পর্কে ঠিক সেভাবে সংশয় প্রকাশ করেনি, যে-কোনোভাবেই হোক তাঁর নিরাপত্তা সংক্রান্ত ছাড়পত্র দিতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করা হয়, তিনি পরমাণু শক্তি কমিশন থেকে অবসর লাভ করেন এবং এতে টেলারের ‘পরা’-তে আরোহণ মসৃণ হয়ছিল।
সাধারণভাবে তাপ-নিউক্লিয় অস্ত্র তৈরীর প্রযুক্তির উদ্ভাবকরূপে টেলার ও গণিতবিদ Stanislas Ulm-কে গণ্য করা হয়। ম্যানহাটান প্রকল্পে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত পদার্থবিজ্ঞানী Hans Bethe তত্ত্বীয় বিভাগের নেতৃত্ব দেন, তিনি পরমাণু বোমা ও হাইড্রোজেন বোমার উদ্ভাবনে অন্যতম প্রধান ভূমিকা পালন করেন। তিনি বলেন যে টেলারের প্রারম্ভিক ধারণাসমূহ ত্রুটিপূর্ণ ছিল, এবং তাপ-নিউক্লিয় অস্ত্রের বাস্তব রূপায়ণে বহু মানুষের শ্রমের প্রয়োজন ছিল। তরুণ পদার্থবিজ্ঞানী Richard Garwin-এর মৌলিক প্রযুক্তিগত অবদানের ফলে ১৯৫২-এ প্রথম মার্কিন তাপ-নিউক্লিয় অস্ত্রের বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। এটি ক্ষেপনাস্ত্র বা বোমারু বিমানে অবহনযোগ্য ছিল; এটি সংযোজনের পর একই স্থানে বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। এক বছর পরে বিস্ফোরিত সত্যিকার হাইড্রোজেন বোমা ছিল সোভিয়েত আবিষ্কার। একটি বিতর্ক ছিল- যদি যুক্তরাষ্ট্রের তাপ-নিউক্লিয় অস্ত্র না-থাকতো তবে সোভিয়েত ইউনিয়ন এই অস্ত্রের উদ্ভাবন করতো কিনা; এবং যেহেতু ততদিনে যুক্তরাষ্ট্রের দখলে যথেষ্ট পরিমাণ ফিসন মারণাস্ত্রাদি ছিল, এই পরিপ্রেক্ষিতে সোভিয়েতদের হাইড্রোজেন বোমা ব্যবহার হতে বিরত রাখতে বাধ্য করার লক্ষ্যে মার্কিন তাপনিউক্লিয় মারণাস্ত্র আদৌ অপরিহার্য ছিল কিনা। বর্তমানে জানা তথ্যাদি এই ধারণাকে গুরুত্ব দেয় যে প্রথম ফিসন বোমা বিস্ফোরণের পূর্বেই সোভিয়েত ইউনিয়নে তাপ-নিউক্লিয় অস্ত্রের কার্যকর নক্সা ছিল। এটি ছিল পরবর্তী যৌক্তিক পদক্ষেপ। কিন্তু ফিউসন অস্ত্র লাভের সোভিয়েত প্রচেষ্টা প্রভূত অগ্রগতি লাভ করেছিল মার্কিনীদের গবেষণা-কর্ম থেকে গোয়েন্দাগিরির মাধ্যমে প্রাপ্ত জ্ঞানের সাহায্যে।
আমার দৃষ্টিতে হাইড্রোজেন বোমা আবিষ্কারের ফলে ভূ-ময় নিউক্লিয় যুদ্ধের পরিণতি আরও ভয়াবহ রূপ লাভ করেছে। কারণ, তাপ-নিউক্লিয় অস্ত্রাদির বায়ুমন্ডলে বিস্ফোরণ মানেই নগরীর অধিকতর প্রজ্জ্বলন, বিপুল আয়তনে ধুঁয়া উৎপাদন, পৃথিবীর হিমায়িতকরণ ও অন্ধকারাচ্ছন্নকরণ, এবং গ্রহব্যাপী নিউক্লিয় শীতের সূত্রপাত। এটি ছিল সম্ভবত সবচেয়ে আলোচিত বৈজ্ঞানিক বিতর্ক যার সাথে আমি জড়িত (সম্ভবত ১৯৮৩--১৯৯০)। বিতর্কটি অধিকতর রাজনীতি তাড়িত। নিউক্লিয় আক্রমণকে যারা প্রতিহত করার পক্ষে উকালতি করেন অথবা যারা প্রথমেই প্রচন্ড আক্রমণের অপসনকে সংরক্ষণ করতে আগ্রহী, এই উভয় পক্ষের জন্যই নিউক্লিয় শীতের কৌশলগত ধারণাটি হতাশাব্যঞ্জক। এই উভয় ক্ষেত্রেই পরিবেশগত ফলাফল প্রভূত সংখ্যায় তাপ-নিউক্লিয় অস্ত্র স্থাপনকারী যে কোনও জাতিকে এমনকি শত্রুপক্ষ থেকে কোনও রকম আঘাত ব্যতিতই স্ব-ধ্বংসের জন্য কার্যকর। দশকব্যাপী কৌশলগত পলিসির প্রধান অংশগুলো এবং দশ সহস্রাধিক নিউক্লিয় অস্ত্রের সংগ্রহ সহসাই অধিকতর মাত্রায় অগ্রহনযোগ্য হয়ে পড়েছিল।
১৯৮৩-তে মূল নিউক্লিয় শীত সংক্রান্ত বৈজ্ঞানিক নিবন্ধে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল যে ভূ-ময় তাপমাত্রার হ্রাস হবে ১৫-২০° সে.। বর্তমান অনুমান হচ্ছে ১০-১৫° সে.। গণনার মধ্যে হ্রাসকরণের অযোগ্য অনিশ্চয়তাসমূহকে বিবেচনার মধ্যে রেখেও দেখা যায় যে এ দু’টি ফলাফল একে অপরের পরিপূরক। বর্তমান ভূ-ময় তাপমাত্রা এবং শেষ বরফ যুগের তাপমাত্রার পার্থক্য থেকে এই দু’টি তাপমাত্রা হ্রাসের মান অধিকতর। ২০০ বিজ্ঞানীর একটা টিম ভূ-ময় তাপ-নিউক্লিয় যুদ্ধের দীর্ঘকালীন ফলাফল নিরূপণ করেছেন। এরা উপসংহারে বলেছেন যে ভূ-ময় সভ্যতা এবং উত্তরাংশের মধ্য অক্ষাংশের টার্গেট অঞ্চল থেকে দূরবর্তী এলাকার জনগণসহ পৃথিবীর বিপুল জনগোষ্ঠী বিপদের সম্মুখীন মূলত দুর্ভিক্ষ থেকে। যদি বৃহৎ পরসরে নিউক্লিয় যুদ্ধ সংঘটিত হয় টার্গেটকৃত নগরীসমূহে তবে এডওয়ার্ড টেলার ও তাঁর সহকর্মীবৃন্দের প্রচেষ্টাই দায়ী হতে পারে মানব সমাজের ভবিষ্যতের উপর যবনিকা টানার জন্য। এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত অস্ত্রসমূহের মধ্যে হাইড্রোজেন বোমা হচ্ছে সবচেয়ে ভয়াবহ অস্ত্র।
১৯৮৩-তে নিউক্লিয় শীত আবিষ্কৃত হলে টেলার তাড়াহুড়ো করে যুক্তি দিলেন যে (১) পদার্থবিদ্যার কোনও ভুল হয়েছিল, এবং (২) Lawrence Livermore Laboratory-তে কয়েক বৎসর পূর্বেই এই আবিষ্কারটি সম্পন্ন হয়েছিল। কিন্তু এরূপ পূর্ব আবিষ্কারের কোনও প্রমাণ নেই। যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে যে প্রত্যেক দেশে নিউক্লিয় অস্ত্রের প্রভাব (effect) সম্পর্কে জাতীয় নেতৃবৃন্দকে তথ্য প্রদানের দায়িত্বে নিয়োজিতগণ সযত্নে নিউক্লিয় শীতকে এড়িয়ে গেছেন। কিন্তু টেলার যদি সঠিক হয়ে থাকেন, তখন তিনি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এমন পক্ষগুলো, অর্থাৎ তাঁর দেশের নাগরিক ও নেতৃবৃন্দ এবং বিশ্বকে এই দৃশ্যত (purported) আবিষ্কার সম্পর্কে প্রচার না চালিয়ে শুভ বুদ্ধির পরিচয় দেননি। Stanley Kubrick-এর চলচ্চিত্র Dr. Strangelove-এর ন্যায় চরম অস্ত্রকে শ্রেণীবদ্ধকরণ একটি চুড়ান্ত বিমূর্তায়ন (absurdity)। কেউ জানে না যে এটির অস্তিত্ব আছে কিনা বা এটা কী করতে পারে।
এমনকি নিউক্লিয় শীতের ধারণাকে বাদ দিয়েও আমার মনে হয় যে-কোনো স্বাভাবিক মানুষ এ ধরণের আবিষ্কারের সহায়তা করে নিরুপদ্রপ থাকতে পারে না। পরিকল্পনাটির যারা কৃতিত্ব নিতে চান তাঁদের উপর সচেতন বা অসচেতন গুরুত্ব বিবেচনার দাবী রাখে। তাঁর অবদান যাই হোক না কেন, এডওয়ার্ড টেলার ব্যাপকভাবে হাইড্রোজেন বোমার “জনক” হিসেবে পরিচিত। ১৯৫৪-তে একটি প্রশংসনীয় নিবন্ধে লাইফ ম্যাগাজিন তাঁর হাইড্রোজেন বোমা তৈরীর প্রায় গোড়ামিপূর্ণ সংকল্পের বর্ণনা দিয়েছিলো। আমি মনে করি যে উত্তরকালে তাঁর অধিকাংশ অর্জনকে বুঝতে হবে তিনি যা অর্জন করেছেন তারই নায্যতা প্রতিপাদনের প্রচেষ্টা হিসেবে। বাহ্যত চমৎকাররূপে টেলার যুক্তি দেন যে হাইড্রোজেন বোমা শান্তি বজায় রেখেছে, অথবা কমপক্ষে তাপনিউক্লিয় যুদ্ধকে প্রতিহত করেছে, কারণ বর্তমানে নিউক্লিয় অস্ত্রে সজ্জিত শক্তিধর দু’টি জাতির মধ্যকার যুদ্ধের পরিণতি খুবই ভয়াবহ। আমরা কি এ পর্যন্ত একটি নিউক্লিয় যুদ্ধ পেয়েছি, মোটেই না। কিন্তু এ ধরণের সকল যুক্তি ধরে নেয় যে ব্যতিক্রমহীনভাবেই নিউক্লিয় অস্ত্রে জাতিসমূহ সর্বদা বাস্তব বিচারবুদ্ধি সম্পন্ন অভিনেতা হবে। ক্রোধ, প্রতিশোধ এবং উম্মাদগ্রস্ততার খেপসমূহ কখনই তাঁদের নেতৃবৃন্দকে অথবা নিউক্লিয় নিউক্লিয় অস্ত্রের দায়িত্বে নিয়োজিত সমর এবং গুপ্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের গ্রাস করবে না। হিটলার ও স্তালিনের শতাব্দীতে এটি অসম্ভব মনে হয়।
নিউক্লিয় অস্ত্র পরীক্ষার সর্বাত্মক নিষিদ্ধকরণ চুক্তিকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য টেলার ছিলেন প্রধান নাটের গুরু। ১৯৬৩-এর ভূমন্ডলের উপর অস্ত্র পরীক্ষার সীমিত নিষিদ্ধকরণ চুক্তির বাস্তবায়নকে অধিকতর কষ্টকর করে তুলেছিলেন। তার যুক্তি ছিল যে নিউক্লিয় অস্ত্রসমূহের উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনার জন্য ভূমন্ডলের উপর পরীক্ষা করা দরকার। কাজেই চুক্তিটি অনুমোদনে আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে। যুক্তিটি দৃশ্যত চমৎকার। তিনি সর্বদা এই মর্মে উচ্চকন্ঠ ছিলেন যে, ফিসন পাওয়ার প্ল্যান্টস হচ্ছে নিরাপদ ও ব্যয়সাশ্রয়ী (cost effective)। ১৯৭৯-তে পেনসিলভানিয়ার থ্রিমাইল আইল্যান্ডের নিউক্লিয় দুর্ঘটনার একমাত্র আহতরূপে নিজেকে দাবী করতেন। এই ইস্যুটির বিতর্ককালে তিনি বলতেন যে তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন।
আলাস্কা হতে দক্ষিণ আফ্রিকা হয়ে বিস্তৃত অঞ্চলে পোতাশ্রয় ও খাল খননে, উপদ্রুত পর্বতসমুহের ধ্বংস সাধনে ও ভূ-ত্বকের ব্যাপক স্থানান্তরের জন্য টেলার নিউক্লিয় অস্ত্রের বিস্ফোরণের পক্ষে উকালতি করেন। তিনি এরকম একটি প্রকল্প (scheme) গ্রীসের রাণী Frederika-এর নিকট উত্থাপন করেন, প্রত্যুত্তরে রাণী বলেন, “ধন্যবাদ ড. টেলার, কিন্তু গ্রীসের ইতোমধ্যে যথেষ্ট ধ্বংসাবশেষ রয়েছে।” আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্ব পরীক্ষা করতে চান? তখন সে সূর্যের দূরবর্তী প্রান্তে নিউক্লিয় অস্ত্রের বিস্ফোরণ ঘটান, টেলার প্রস্তাব করেন। চাঁদের রাসায়নিক গঠন অনুধাবন করতে চান? তখন চাঁদে হাইড্রোজেন বোমা নিন, বিস্ফোরিত করুন এবং অগ্নিচ্ছটা ও অগ্নিপিন্ডের বর্ণালী বিশ্লেষণ করুন।
আশির দশকে টেলার প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগানের নিকট তারকা যুদ্ধের ধারণাটিও ফেরি করেন। এটিকে তারা ‘কৌশলগত প্রতিরক্ষা উদ্যোগ’ বা SDI নামে অভিহিত করতেন। টেলারের অতিমাত্রায় কাল্পনিক গল্পটি রিগান মনে হয় বিশ্বাস করেছিলেন। ডেস্ক-আকৃতির অরবিটিং হাইড্রোজেন বোমা চালিত এক্স-রশ্মি লেজার তৈরী করা সম্ভব যা দিয়ে উড়ন্ত ১০,০০০ সোভিয়েত ওয়ারহেড ধ্বংস করা যেত এবং ভূ-ময় তাপ-নিউক্লিয় যুদ্ধে যা হতো যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের যথাযথ প্রতিরক্ষা।
রিগান প্রশাসনের পক্ষ সমর্থনকারীগণ দাবি করতেন SDI সম্পর্কে অতিরঞ্জন যাই থাক না কেন, এটি অংশত ছিল উদ্দেশ্যমূলক এবং এই কর্মসূচীটিই সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের জন্য দায়ী ছিল। এই দাবীর পক্ষে জোড়ালো কোনো তথ্য প্রমাণ নেই। আন্দ্রেই শাখারভ, ইয়েভগেনি ভেলিকভ, রোয়াল্দ সাজদিফ এবং অন্যান্য বিজ্ঞানীবৃন্দ প্রেসিডেন্ট মিখাইল গর্বাচভকে পরামর্শ দেন যে যদি যুক্তরাষ্ট্র বাস্তবিকই তারকা যুদ্ধের কর্মসূচী নিয়ে অগ্রসর হয় তাহলে সবচেয়ে নিরাপদ ও অর্থসাশ্রয়ী সোভিয়েত প্রতি-উত্তর হবে এর বর্তমান নিউক্লিয় অস্ত্র সম্ভার ও ডেলিভারি সিস্টেমের বৃদ্ধি ঘটানো। এভাবে তারকা যুদ্ধ কেবলমাত্র তাপ-নিউক্লিয় যুদ্ধের বিপদকে বাড়িয়ে তুলতে পারতো, কোনো ভাবেই হ্রাস করতে পারতো না। যে-কোনো বিবেচনাতেই আমেরিকার নিউক্লিয়ার ক্ষেপনাস্ত্রের ব্যয়ের তুলনায় মহাশূন্য-ভিত্তিক সোভিয়েত ব্যয় ছিল তুলনামূলকভাবে নগন্য। সোভিয়েত অর্থনীতির ধসে এই মাত্রা নগন্য। সোভিয়েত অর্থনীতির পতনে কর্তৃত্ববাদী অর্থনীতির ব্যর্থতা, উচ্চতর জীবনযাত্রা মান সম্পর্কে ক্রমাগত সচেতনতা মুমুর্ষ সাম্যবাদী আদর্শ সম্পর্কে অসন্তোষই অধিকতর দায়ী ছিল। যদিও তিনি এরকম ফলাফল আশা করেননি, কিন্তু গর্বাচভের পেরেস্ত্রইকা ও গ্লাসনস্তের প্রচারও দায়ী ছিল।
দশ সহস্রাধিক বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদ জনসম্মুখে প্রতিজ্ঞা করেন যে তাঁরা তারকা যুদ্ধের উপর কোনা গবেষণা করবেন না বা SDI সংস্থা থেকে কোনো অর্থ গ্রহণ করবেন না। এটি ছিল গণতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে বিজ্ঞানীদের ব্যাপক ও সাহসী অসহযোগ। এজন্য অন্ততপক্ষে অস্থায়ীভাবে সরকার তার পথ হারিয়েছিল।
টেলার সুড়ঙ্গ (burrowing) নিউক্লিয় ওয়ারহেডের উন্নয়নের পক্ষেও প্রচারণা চালান। শত্রু জাতির ভূগর্ভস্থিত কমান্ড সেন্টার এবং নেতৃবৃন্দ ও তাদের পরিবারবর্গের আশ্রয়কেন্দ্র খুঁড়ে ধ্বংস করা যাবে। কোনো রকম ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই ০.১ কিলোটিন নিউক্লিয় ওয়ারহেড শত্রুদেশের অবকাঠামো ধ্বংস সাধনের জন্য যথেষ্ট। নিউক্লিয় যুদ্ধ মানবিক।
আশির দশকের শেষ দিকেও এডওয়ার্ড টেলারের যথেষ্ট প্রভাব প্রতিপত্তি সম্পন্ন বৌদ্ধিক ক্ষমতা ছিল। তিনি প্রাক্তন সোভিয়েত নিউক্লিয় অস্ত্র এস্টাবলিশমেন্ট প্রতিপক্ষের সহযোগে মহাশূন্যে পৃথিবীর সাথে সংঘর্ষ হতে পারে এমন কক্ষপথের গ্রহাণুসমূহকে কক্ষচ্যুত বা ধ্বংস করার লক্ষ্যে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন তাপ-নিউক্লিয় অস্ত্রের উন্নয়নের জন্য প্রচারণার সূত্রপাত করেছেন। আমি উদ্বিগ্ন যে আমাদের প্রজাতির জন্য চুড়ান্ত বিপদ বয়ে আনতে পারে নিকটস্থ গ্রহাণুসমূহের কক্ষপথগুলোর অপরিণত পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলে।
ব্যক্তিগতভাবে ড. টেলার ও আমি সাক্ষাৎ করেছি। বৈজ্ঞানিক সভায়, জাতীয় মাধ্যমে এবং কংগ্রেসের রুদ্ধদ্বার সেশনে আমরা বিতর্ক করেছি। বিশেষভাবে তারকা যুদ্ধ, নিউক্লিয় শীত এবং গ্রহাণু প্রতিরক্ষার ব্যাপারে আমাদের মতানৈক্য রয়েছে। সম্ভবত এ সমস্তই নৈরাশ্যকররূপে তাঁর সম্পর্কে আমার ধারণাকে বহুবর্ণে রঞ্জিত করেছে। যদিও তিনি সর্বদাই কমিউনিস্ট বিরোধী এবং প্রযুক্তির সপক্ষে, তবুও তাঁর জীবনের পেছনের দিকে ফিরে তাকালে দেখতে পাই যে হাইড্রোজেন বোমাকে যুক্তিসঙ্গত করার প্রচেষ্টায় তিনি বেপরোয়া ছিলেন। আপনারা যতটা ভাবুন এর প্রভাব হয়তো ততটা খারাপ নয়। এটিকে ব্যবহার করা যেতে পারে বিজ্ঞান, পুরকৌশলের জন্য এবং পৃথিবীকে অন্য হাইড্রোজেন বোমাগুলো থেকে রক্ষা করার জন্য। শত্রুর তাপ-নিউক্লিয় বোমার হাত থেকে যুক্তরাষ্ট্রের জনগণকে রক্ষার জন্য, যুদ্ধবকে মানবিকভাবে পরিচালনার জন্য, মহাশূন্যের ইতস্তত বিক্ষিপ্ত জঞ্জাল থেকে আমাদের গ্রহকে রক্ষার জন্য এটার ব্যবহার হতে পারে। যে-কোনো ভাবে এবং যে-কোনো জায়গায় তিনি বিশ্বাস করতে চান যে তিনি এবং তাপ-নিউক্লিয় অস্ত্রসমূহ মানবজাতি কর্তৃক স্বীকৃত হবে তাঁদের ত্রাতা হিসেবে, কিন্তু বিধ্বংসীকারীরূপে নয়।
যখন মোহগ্রস্ত জাতি এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব বৈজ্ঞানিক গবেষণা হতে প্রচন্ড এবং ভয়ংকর শক্তি লাভ করে, তখন তারা অনেক বিপদের প্রতিনিধি হয়ে দাঁড়ান। এদের একটি হচ্ছে যে এর সাথে জড়িত কতিপয় বিজ্ঞানী বিষয়মুখতার অগভীর সাদৃশ্য ব্যতিত অন্য সবকিছুই হারিয়ে ফেলে। কারণ, ক্ষমতা সর্বদাই দুর্নীতিগ্রস্ত করে তোলার চেষ্টা করে। এই প্রেক্ষাপটে গোপনীয়তার প্রতিষ্ঠান বিশেষভাবে ক্ষতিকর এবং গণতন্ত্রের checks and balance অতীব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। (টেলার গোপনীয়তার সংস্কৃতিতে বিকশিত বলে পুনঃপুনঃ একে আক্রমণ করেন।) ১৯৯৫-এ সিআইএ ইন্সপেক্টর জেনারেল মন্তব্য করেন যে চরম গোপনীয়তা চরমভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত করে। প্রযুক্তির সবচেয়ে ভয়ংকর অপব্যবহারের বিরুদ্ধে প্রায়ই একমাত্র প্রতিরোধ হচ্ছে খুবই খোলামেলা জোড়ালো বিতর্ক। যদি মুখ খোলবার জন্য কোনো শাস্তি না-থাকে তবে কতিপয় বিজ্ঞানী বা এমনকি সাধারণ জনগণও প্রতি-যুক্তির ছিদ্রান্বেষী অংশসমূহ নিয়ে এগিয়ে আসেন- এটা কিছুটা অনিবার্য। অথবা এটা একটা কিছু যা খুবই সুক্ষ্ম, যা ওয়াশিংটন ডিসি হতে দূরবর্তী স্থানের কোনো এক অখ্যাত গ্রাজুয়েট শিক্ষার্থীর গোচরীভূত হয় - যার পক্ষে কোনো এক সময়ে এই ইস্যুুটির ব্যাপারে সমালোচনা করা সম্ভব হতো না যদি এই বিতর্ক গোপন ও রুদ্ধদ্বারে অনুষ্ঠিত হতো।
মানব সাধনার কোন্ জগৎটি নৈতিকভাবে সংশয়মুক্ত নয়? এমনকি ব্যবহার (behavior) এবং নীতি (ethics) সংক্রান্ত বিষয়ে আমাদের পরামর্শ প্রদানকারী লোক-প্রতিষ্ঠানগুলোর দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষে লিপ্ত। কতকগুলো প্রবচন বিবেচনা করা যাক।: তাড়াহুড়োর পরিণাম আক্ষেপ- হ্যাঁ, কিন্তু সময়ের এক ফোঁড় অসময়ের দশ ফোঁড়। পরে দুঃখ পাওয়ার থেকে পূর্বেই সাবধান হওয়া ভালো, কিন্তু কষ্ট ছাড়া কেষ্ট মেলে না। যে-কোনো গুজনের পেছনে নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে। বাইরের রূপ দেখেক কাউকে চেনা যায় না। একটি পয়সা সঞ্চয়ের অর্থ হচ্ছে একটি পয়সা আয় করা; কিন্তু এটি তোমার সাথে নিতে পারো না। তাড়াহুড়োর পরিণাম পরাজয়। কিন্তু ফেরেস্তা যেখানে বিচরণে ভীত সন্ত্রস্ত, সেখানে বোকা ঝাঁপ দেয়। দু’টি মাথা একটি মাথার থেকে শ্রেয়; কিন্তু অধিক সন্নাসীতে গাঁজন নষ্ট। এ ধরণের বিরোধাত্মক মামুলি প্রবচনের উপর ভিত্তি করে এক সময় তাঁদের কর্মের পরিকল্পনা বা নায্যতা প্রতিপাদন করতো। জ্ঞানগর্ভ প্রবচকদের নৈতিক দায়িত্ব কী? অথবা সূর্য-প্রতীক জ্যোতিষী, tarot card reader, টেবলয়েড পয়গম্বদের?
অথবা প্রধান ধারার ধর্মগুলো বিবেচনা করা যাক। মিকাতে (Micah) আমরা সঠিকভাবে কর্ম সম্পাদন করতে এবং ক্ষমা করতে ও ভালবাসতে আদেশপ্রাপ্ত হয়েছিলাম; Exodus-এ আমাদের খুন করতে নিষেধ করা হয়েছে; Leviticus-এ আমাদের নিজেদের মতই প্রতিবেশীদের ভালবাসতে আদেশপ্রাপ্ত হয়েছি। গোসপেলে আমাদের শত্রুদের ভালবাসার জন্য আবেদন করা হয়েছিল। এখন চিন্তা করে দেখুন যে এ সমস্ত অর্থবোধক উপদেশসমৃদ্ধ বইগুলোর ঐকান্তিক অনুসারীগণই রক্তের নদী বইয়েছে।
যশুয়া ও সংখ্যা-এর দ্বিতীয়ার্ধে কেনানের সমগ্র ভূমিতে নগরীর পর নগরীতে গৃহপালিত পশুরও অধঃস্তন বিবেচনা করে পুরুষ, নারী ও শিশুর গণহত্যা উৎসাহের সাথে পালিত হয়েছে। “পবিত্র যুদ্ধ” খারেমে জেরিকো নিশ্চিহ্ন করে ফেলা হয়েছিল। গণহন্তাকারকদের খুনের পক্ষে একমাত্র যুক্তি ছিল যে নিজেদের সন্তানদের বলি এবং বিশেষ ধরণের একগুচ্ছ ধর্মীয় আচরণ প্রবর্তনের মাধ্যমে তাঁদের পূর্ব পুরুষগণ বহু পূর্বেই প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে এই ভূমি তাদের ভূমি। পবিত্র গ্রন্হে উৎখাত অভিযান সম্পর্কে কোনো চার্চীয় বা স্বর্গীয় উৎকন্ঠা বা ক্ষীণ উচ্চারণ বা আত্ম-সমালোচনার আভাসই নেই। তার পরিবর্তে ইসরাইলের লর্ড ভগবানের নির্দেশে যশুয়া ঐ ভুমিতে নিঃশ্বাসরতদের উৎখাত করে (যশুয়া ১০.৪০)। এবং এই ঘটনাবলী দৈবাৎ নয়। বরং পুরাতন টেস্টামেন্টের প্রধান উপাখ্যানের অভিঘাতের কেন্দ্রবিন্দু। Saul ও Esther-এর কিতাবসহ বাইবেলের কোথাও কোথাও এ ধরণের গণহত্যার সাক্ষাৎ মেলে কোনো রকম নৈতিক সংশয়ের অনুশোচনা ছাড়াই। উত্তরকালের উদারনৈতিক ধর্মতাত্ত্বিকদের জন্য নিঃসন্দেহে এটি ছিল অস্বস্তিকর।
এটি যথার্থ উক্তি যে “শয়তানও তার উদ্দেশ্য সাধনের জন্য পবিত্র ধর্মগ্রন্হকে উদ্ধৃত করতে পারে।” পরস্পর বিরোধী নৈতিক উদ্দেশ্য সমৃদ্ধ বহু গল্প দিয়ে বাইবেল পরিপূর্ণ। অগম্য-গমন, দাসত্ব এবং গণহত্যা হতে শুরু করে সর্বাপেক্ষা পরিশুদ্ধ ভালবাসা, সাহস এবং আত্মোৎসর্গসহ যে-কোনো কর্মের কিতাবীয় সত্যতার প্রতিপাদক যুক্তি খুঁজে পেতে পারে প্রত্যেক প্রজন্ম। এবং এই নৈতিক বহুবিধ ব্যক্তিত্বের নৈরাজ্য কেবলমাত্র জুদাইজম ও খ্রীস্টিয় মতবাদেই সীমাবদ্ধ নয়। আপনারা এটি দেখতে পাবেন ইসলামে, হিন্দু ঐতিহ্যে, বাস্তবত পৃথিবীর সকল ধর্মে। সম্ভবত তখন বিজ্ঞানীগণ একমাত্র জনগণ নয় যারা নৈতিকভাবে দ্ব্যার্থক।
সম্ভাব্য বিপদ, বিশেষভাবে যা বিজ্ঞানোদ্ভূত বা বিজ্ঞানের ব্যবহার হতে পূর্ব পরিজ্ঞেয় এ সম্পর্কে জনগণকে সতর্কীকরণ, বিজ্ঞানীদের বিশেষ কাজ বলে আমি বিশ্বাস করি। আপনি বলতে পারেন যে এরকম মিশন দৈবজ্ঞীয়। হুশিয়ারি সুস্পষ্টভাবে সুবিবেচনাপূর্ণ হবে এবং যতটুকু বিপদজনক তার থেকে অতিরঞ্জিত হবে না। কিন্তু আমরা অবশ্যি ভুল করতে পারি প্রাপ্ত ঝুঁকির মধ্যে, তা হওয়া উচিত নিরাপত্তার স্বপক্ষে।
কালাহারি মরুভূমির Kung San শিকারী গোষ্ঠীর মধ্যে, যখন testosterone-উদ্দীপ্ত দু’জন পুরুষ ঝগড়া শুরু করতো, তখন মেয়েরা বিষ মাখানো তীরগুলো নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে রাখতো। বর্তমানের আমাদের বিষাক্ত তীর ভূ-ময় সভ্যতা ধ্বংস করতে পারে এবং আমাদের প্রজাতিকে সম্ভবত নিশ্চিহ্ন করতে পারে। এখন নৈতিক দ্ব্যর্থকতার মাশুল খুবই চড়া। এজন্য বিজ্ঞানের প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছাড়াও বিজ্ঞানীর নৈতিক দায়-দায়িত্ব খুবই উঁচু, অসাধারণভাবে উঁচু, অভূতপূর্বভাবে উঁচু থাকা অবশ্যি দরকার। আমার প্রত্যাশা গ্রাজুয়েট বিজ্ঞান কর্মসূচী সুনির্দিষ্টভাবে ও প্রণালীবদ্ধভাবে এই প্রশ্নগুলো উত্থাপন করবে তরুণ অনভিজ্ঞ বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীর নিকট। এবং এবং কখনো কখনো আমি ভাবি যে আমাদের সমাজে নারী ও শিশু অবশেষে ক্ষতিকর পথ থেকে বিষ মাখানো তীর উৎপাটিত করবে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন