তোমার কেন মার্কসবাদী হওয়া উচিত
মূল: জুডি কক্স
অনুবাদ: স ম আজাদ
প্রতিটা দিনই পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার অশ্লীলতার অধিকতর প্রমাণ নিয়ে আসে। এতে আশ্চর্য হওয়া উচিত নয় যে দুনিয়াব্যাপী নিযুত নিযুত মানুষ সমাজতন্ত্রে সঙ্গে একাত্ববোধ করে।
কিন্তু সমাজতন্ত্রী হওয়া বলতে কি বুঝায় – এ সম্পর্কে অনেক পৃথক পৃথক ধারণা আছে।
কার্ল মার্কস এবং ফ্রেডেরিখ এঙ্গেলসের পূর্বেও অনেক সমাজতন্ত্রী ছিলেন, তাঁরা তাঁদের তত্ত্বাবলী বিকশিত করেন। তাঁরা বিশ্বাস করতেন পুঁজিতন্ত্র স্পষ্টতই ভ্রান্ত, তাই তাঁরা প্রত্যেককে বুঝাতে পারবেন যে সমাজতন্ত্র অধিকতর নায্য এবং সুন্দর।
সমাজতন্ত্রীরা মনে করতে পারেন যে শ্রমিকেরা শোষিত, মালিকগণ লোভী ও ব্যবস্থা বৈষম্য তৈরী করে. এই কথাগুলো তাঁদের বলতে মার্কসবাদীদের দরকার নেই। তাঁরা বলেন অভিজ্ঞতাগুলোই তাদের দেখানো যথেষ্ট যে সমাজে কি ভুল আছে।
শ্রমিকেরা নির্যাতিত, মার্কসবাদ এই কথাই কেবল বলেন না। মার্কসবাদের মূল নিহিত শ্রমিকদের স্ব-মুক্তির ধারণায়, এ কথাও বলেন।
যে দুনিয়া আমরা পাল্টাতে চাই, সেই দুনিয়াটা কীভাবে আমাদের কৌশলগুলোকে আকার দেয় তা আমরা বুঝি। পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থাটা বৈজ্ঞানিক উপায়ে বিশ্লেষণ করতে মার্কস এবং এঙ্গেলস পুঁজিতন্ত্রের নিষ্ঠুরতাগুলোর বিরুদ্ধে নৈতিক বিতৃষ্ণাকে অতিক্রম করেন।
ব্যবস্থাকে সামনে এগিয়ে নিতে যে লুকায়িত প্রক্রিয়াবলী কাজ করে তা অনুসন্ধান করতে তাদের পদ্ধতি ছিল সমাজের উপরিতলের দৃশ্যমানতার নিচে অবলোকন।
এই পদ্ধতির গুরুত্ব আছে। শাসক শ্রেণী উপস্থাপন করে দুনিয়া সম্পর্কে তাদের নিজেদের ছবি এবং এটার পরিবর্তনের খুবই সীমিত সম্ভাবনাগুলো।
আমুল রূপান্তরের জন্য আমাদের নিজেদের বোঝাপড়া এবং কৌশলসমূহ দিয়ে তাদের রূপকল্পকে আমাদের মোকাবেলা করতে হবে।
সমাজকে ব্যাখ্যা করতে যে মহাবয়ান ও দাপ্তরিক রাজনীতি (grand ideas and official politics) জনগণ ব্যবহার করতে অভ্যস্থ ছিলেন, তার বাইরে মার্কস এবং এঙ্গেলস দৃষ্টি নিক্ষেপ করতেন। তাদের জীবন-যাপনে যা প্রয়োজন তা কীভাবে জনগণ উৎপাদন করেন ও এই উৎপাদন প্রক্রিয়াকে কারা নিয়ন্ত্রণ করেন, সেইদিকে তাঁরা দৃষ্টি নিক্ষেপ করতেন।
ইতিহাসের বস্তুবাদী ধারণার মূল হলো এই যে উপরের মানুষদের প্ররোচিত করে পরিবর্তন আনা যায় না, অথবা এক সেট শাসককে অন্য আর এক সেট শাসক দিয়ে প্রতিস্থাপিত করেও। পরিবর্তন আনা যায় শ্রেণী সংগ্রামের মাধ্যমে।
মার্কস এবং এঙ্গেলস কমিউনিস্ট ইশতেহারে বলেন, “এ যাবতকাল অস্তিত্বমান সমাজের ইতিহাস হলো শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস”। তাঁরা লিখেন যে শ্রেণী সংগ্রামের “সবসময় সমাপ্তি ঘটে হয় সমগ্র সমাজের বিপ্লবী রূপান্তরে অথবা প্রতিদ্বন্দ্বী শ্রেণীসমূহের সাধারণ বিনাসে (in the common ruin of the contending classes) ।
বুদ্ধিজীবিগণ প্রায়ই নিরপেক্ষ হওয়ার দাবী করেন, কিন্তু শ্রেণীবিভক্ত সমাজে নিরপেক্ষতা অসম্ভব। ধারণাবলী সবসময়ই কোনো না কোনো শ্রেণীর সঙ্গে সম্পর্কিত।
একাডেমিকগণ প্রায়ই সমাজকে উত্থাপন করেন খন্ডিত ভাবে. যেটি এই ধারণা (impression) তৈরী করে যে সমস্যাগুলো একে অপর থেকে পৃথক।
অন্যদিকে, মার্কসবাদীগণ ব্যবস্থাকে দেখে সমগ্র হিসেবে। তার অর্থ এই না যে অমার্কসবাদী ইতিহাসবিদ এবং বিজ্ঞানীদের গুরুত্বপূর্ণ অন্তর্দৃষ্টি প্রত্যাখ্যান। এর অর্থ তাদেরকে মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে অন্তর্ভূক্ত করা।
সমাজে সংঘটিত পরিবর্তনগুলো চিহ্নিত করতে এবং সেগুলোতে কীভাবে সাড়া দিতে হবে সেই কার্যাবলী বের করতে মার্কসবাদীগণ সমাজ পর্যবেক্ষণ করে।
সুতরাং মার্কসবাদ একটি জীবন্ত ঐতিহ্য। শ্রমিক শ্রেণীর স্ব-সক্রিয়তার কেন্দ্রিকতাকে পরিত্যাগ না করেই, নির্যাতিতদের নয়া ধারণা এবং বিকাশ এবং সংগ্রামের প্রতিক্রিয়াতেই (in response) মার্কসবাদের বিকাশ।
মার্কস লিখেন যে পুঁজিতন্ত্র তার নিজের কবর খনককে তৈরী করে। প্রত্যেকটি নতুন ফ্যাক্টরি, কল সেন্টার বা বিতরণ নেটওয়ার্কে শ্রমিকদের নিযুক্তিতে শেয়ারকৃত অবস্থা জড়িত থাকে (involves recruiting workers into shared conditions) ।
মার্কসবাদীরা নিরপেক্ষ নন। আমরা দুনিয়াকে দেখি বৈশ্বিক শ্রমিকশ্রেণীর দৃষ্টিকোন থেকে। পুঁজিতান্ত্রিক শ্রেণীর পক্ষপাতদুষ্ট ধারণাবলীর চেয়ে কেন এটি অধিকতর ভালো?
মার্কসের কথায়, শ্রমিক শ্রেণীর আন্দোলন হলো বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠের সচেতন আন্দোলন, বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বার্থে।
পুঁজিতন্ত্রের উৎখাত ঠিক কেবলমাত্র সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বার্থেই নয়। গণতান্ত্রিক, যৌথ মালিকানা এবং প্রয়োজনের জন্য উৎপাদনের ওপর ভিত্তি করে একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা, যেটি কেবল একটিমাত্র পথ সমগ্র মানব জাতির নিরপত্তা এবং স্বাধীনতা অর্জনে।
সূত্র: Socialist Worker, Friday 03 October 2025, Issue 2976
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন