মার্কসবাদ এবং শিল্প
মূল: জুডি কক্স
অনুবাদ: স ম আজাদ
[অনুবাদকের কথা: জুডি কক্সের মূল প্রবন্ধটির শিরোনাম “Marxism
and art—What makes an artwork great?”। প্রবন্ধটি লন্ডন থেকে প্রকাশিত Socialist
Worker-Gi Sunday 15 March 2026, 2997 নং সংখ্যায় ছাপা হয়। প্রবন্ধটির বাংলা অনুবাদে শিরোনাম দেয়া হলো মার্কসবাদ এবং শিল্প। প্রবন্ধের লেখক ইস্ট লন্ডনে বসবাসকারী একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। তিনি সমাজতান্ত্রিক লেখক এবং বক্তা। তিনি লন্ডন থেকে প্রকাশিত তাত্ত্বিক জার্নাল ইন্টারন্যাশনাল সোশ্যালিজমের সম্পাদনা বোর্ডের সদস্য। তাঁর প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হলো The
Women’s Revolution: Russia 1905–1917 (Haymarket,
2019), Rebellious Daughters of History (Redwords, 2020)]
শিল্প নিছক শ্বাশত সত্যকেই প্রকাশ করে না, যেটি পরিবর্তর্নশীল দুনিয়ার ওপর অনির্ভরশীল। শিল্প আকার পায় সমাজ দিয়ে। চিত্রকর্ম, ভাস্কর্য, সঙ্গীত অথবা কবিতাকে মহান করে কিসে? দ্রুত এবং সর্বাগ্রে শিল্পকে অবশ্যি বিচার করতে হবে এর মৌলিকতা, দক্ষতা, প্রভাব এবং এর দর্শকদের সঙ্গে সংযোগের ক্ষমতা দিয়ে।
শিল্পীর রাজনৈতিক বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে শিল্পের মূল্যায়ন করা উচিত নয়। কার্ল মার্কসের প্রিয় লেখকদের একজন অনারে দে বালজাক। বালজাক ছিলেন একজন রক্ষণশীল, কিন্তু তাঁর উপন্যাসসমূহ প্রকাশ করে কেতাদুরস্ত সমাজের অনিবার্য অবক্ষয় (inevitable
decay of fashionable society)।
শিল্পকে রাজনৈতিক কর্মসূচীতে কাজে লাগানো উচিত না। যেমনটা লিওন ত্রৎস্কি লেখেন, শিল্প কেবলমাত্র নিয়ন্ত্রণ (order) অন্বেষণ করে না, বরং এর স্বভাবগত কারণে এই নিয়ন্ত্রণ বরদাস্ত করতে পারে না। কিন্তু সমাজতন্ত্রীরা রাজনৈতিকভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ শিল্পকে খুবই গুরুত্ব দেয় যা সমাজ থেকে উদ্ভূত হয় এবং সমাজে বিদ্যমান দ্বন্দ্বসমূহকে উম্মোচিত করে।
তাঁর Karl
Marx and World Literature গ্রন্থে সিগবার্ট সালোমন প্রাওয়ার (Siegbert
Salomon Prawer) বর্ণনা করেন কীভাবে মার্কস সকল শিল্পকে বিশ্বজনীন সৃজনিক কর্মকান্ডের অংশ হিসেবে দেখেন। এই কর্মকান্ডের মাধ্যমেই মানব সত্তা রূপান্তর লাভ করে এবং সৃজন করে তাদের দুনিয়া এবং তাদের নিজেদের। সৃজনিক আত্মপ্রকাশের কর্ম হলো মানুষ হয়ে উঠার (being
human) একটি অপরিহার্য অংশ।
আদিমতম সমাজে শিল্প ছিলো প্রাকৃতিক দুনিয়া অনুধাবনের একটা উপায়। গুহা চিত্র এখনো আমাদের তাড়িত করে, যদিও আমরা যে দুনিয়াতে বসবাস করি তা খুবই পৃথক। শিল্প প্রকাশ করে মানব অস্তিত্ব সম্পর্কে কিছু বিষয় যেমন সৌন্দর্য, ভালোবাসা, ক্ষতি, আকাঙ্খা, ভয় (beauty,
love, loss, desire, fear)। কিন্তু শিল্প নিছক শাশ্বত সত্যকে প্রকাশ করে না যেটি পরিবর্তনশীল দুনিয়ার ওপর অনির্ভরশীল। শিল্প সমাজ দিয়ে আকার পায়। শিল্পকে অর্থনৈতিক নিয়ামকে পরিণত করা যায় না, এটি এমনকি ব্যক্তি জিনিয়াসের মন থেকেও বিস্ময়করভাবে উত্থিত হয় না। প্রকৃতপক্ষে, “জিনিয়াস”এর ধারণা বিকশিত হয় রেনেসাঁর সাথে সম্পর্কিত মহান শৈল্পিক উল্লম্ফনের সাথে। রেনেসাঁর কালে প্রাচীন গ্রিস এবং রোমের শিল্প ও দর্শনের পুনরাবিষ্কারে শিল্পের নয়া আঙ্গিক উৎপত্তি লাভ করে।
একটা নয়া শ্রেণী বুর্জোয়াজীর উত্থানে এই সাংস্কৃতিক প্রস্ফুটন (cultural
flowering) ধীরে ধীরে বদলে যেতে থাকে। ধ্রুপদী ও বাইবেলীয় বিষয় থেকে সম্পদশালী ব্যক্তিবর্গের অমরত্বের দিকে শিল্পের বিকাশ দেখা যায়। পুরাতন সামন্তীয় ধারার শিল্পের বিপক্ষে এর সংগ্রামে উদীয়মান বুর্জোয়া শ্রেণী মহান শিল্পকর্ম তৈরী করে যা মহান “মাস্টারবৃন্দ”-এর সঙ্গে র্যাডিক্যালগতভাবে
ছেদ ঘটায়। স্বাধীনতার জন্য নয়া উদ্দীপনা প্রকাশ করতে তাঁরা উদ্ভাবনীয় আঙ্গিক বিকশিত করেন।
কিন্তু পুঁজিতন্ত্র শিল্পীদের গীর্জা এবং লর্ডদের পৃষ্ঠপোষকতা থেকে মুক্ত করলেও. বাজারের সঙ্গে তাঁদের বেঁধে ফেলে (enslaved)। মার্কস যেমনটি লেখেন, “এখন পর্যন্ত সম্মানজনক এবং শ্রদ্ধাপূর্ণ বিস্ময় সহকারে দেখা এর প্রত্যেকটি মাহিমান্বিত পেশাকে বুর্জোয়া শ্রেণী স্থানচ্যুত করেছে। এই শ্রেণী চিকিৎসক, আইনজীবি, সন্ত, কবি, বিজ্ঞানী (the man of science)-কে তাদের বেতনভোগী শ্রমিকে রূপান্তরিত করেছে। বাজারের অভিরূচির সঙ্গে অভিযোজিত হতে অনিচ্ছুক বা অসমর্থ যারা যেমন কবি ও এনগ্রেভার উইলিয়াম ব্লেক (poet and engraver William
Blake), কেবলি দ্রারিদ্যের মাঝে জীবনযাপন করতেন। মূল্যবান পণ্যে রূপান্তরিত হওয়ার পূর্বে নয়া আঙ্গিকের শিল্প সবসময় বিদ্রুপিত হয়।
১৯১৩-তে ত্রৎস্কি লেখেন, বিদ্বেষপূর্ণ অবাস্তবতা (malicious far-fetchedness) এবং মিথ্যা আচরণের পুরাতন একাডেমিক ভক্তির প্রতিনিধিদের দিয়ে চিত্রকলায় আধুনিকতাবাদ অভিযুক্ত হয়। প্রকৃত পক্ষে, এটা ছিল পুরাতন স্টাইলের বিরুদ্ধে একটা জীবনদায়ী প্রতিবাদ যেটি নিজের কাল অতিক্রম করে এবং একটি ভঙ্গিতে পরিণত হয়।
বাজারে শিল্পকর্মসমূহ বিক্রয় হয়- এই সত্য তাদের ধারণা এবং উৎপাদনের প্রত্যেকটি দিকের আকার দেয়। বানিজ্যিক সফলতার পক্ষে কিছু শিল্পকর্ম ইনটেগ্রিটি পরিত্যাগ করে। কিন্তু শিল্প নিছক অন্য আর একটি পণ্য নয়। এটি সমাজ সম্পর্কে আমাদের উপলব্ধি সমৃদ্ধ করে এবং নয়া সম্ভাবনার দ্বার উম্মোচন করে। ইউজিন লান তাঁর মার্কসবাদ ও আধুনিকাবাদ গ্রন্থে লেখেন, এমনকি এর মহিমা (halo) অপসারণ করা হলেও, পরকীকৃত (alienating) সামাজিক ও অর্থনৈতিক শর্তাবলীর বাইরে গিয়েও শিল্প বিশ্লেষণ ও দিকনির্দেশ (diagnosing
and pointing) করতে সক্ষম।
১৯১৭এর রুশ বিপ্লব শিল্পে পরীক্ষণের একটি তরঙ্গ (a
wave of artistic experimentation) অবারিত করে। অতীতের সকল শিল্পকে বর্জন এবং প্রোলেতারিয় শিল্প দিয়ে এর প্রতিস্থাপন -এই মতের বিরুদ্ধে ত্রৎস্কি যুক্তি দেন। তিনি বরং বলেন যে নয়া আঙ্গিকের শৈল্পিক অভিপ্রকাশ দিয়ে অতিক্রমণের পূর্বে শিল্পীদের অবশ্যি অতীতের মহৎ শিল্পকর্মকে জয় করতে হবে।
ব্যাংক ভল্টগুলোতে ধুলোয় জমা চিত্রকর্মগুলোকে মুক্ত করতে একটি বিপ্লবের প্রয়োজন। বিপ্লব শিল্পকে বাজার থেকে মুক্ত করতে পারে এবং আমাদের জীবনের প্রত্যেকটি ক্ষেত্রের সঙ্গে একে সমন্বিত করতে পারে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন