আমার নানা বাড়ি: বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির সহাবস্থান স ম আজাদ

আমার নানা বাড়ি: বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির সহাবস্থান 

স ম আজাদ 


 আমার নানার নাম হাওয়ালদার কাসেম আলী ভুঁইয়া। ব্রিটিশ আমলে তিনি পুলিশ বিভাগে চাকরি শুরু করেন এবং পাকিস্তান আমলে অবসর নেন। চাকরিজীবনের সুবাদে তিনি ব্রিটিশ আমলের কয়েকজন রাজবন্দীর সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলেন। তাঁদের কাছ থেকেই তিনি সংস্কৃত শ্লোকের প্রাথমিক পাঠ নিয়েছিলেন। তাঁর কাছে অনেক সংস্কৃত শ্লোক শুনেছি ব্যাখ্যাসহ।

নানার আদি বাড়ি ছিল মহেলা ভুঁইয়া বাড়ি। সংগীতের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ ছিল। তরুণ বয়সে তিনি ধ্রুপদী সংগীতের আসরে তবলা সংগত করতেন। তাঁর নিজের মুখেই শুনেছি, ধনবাড়ীর জমিদারবাড়ির সংগীত আসরেও তিনি গিয়েছেন তবলায় সংগত করতে। নানাকে যে বয়সে আমি দেখেছি তখন তাঁর হাতে আর তবলা সংগত করার স্ট্যামিনা ছিল না। কিন্তু তাঁকে আমি এসরাজ বাজাতে দেখেছি। মাগরিবের নামাজের পর তিনি এসরাজ হাতে বসতেন, আর এশার নামাজের আগ পর্যন্ত বাজাতেন। সাধারণত বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হলে সেই যুগে প্রায় মাসব্যাপী নানার বাড়ি থাকতাম আমরা।
নানার এই সংগীত প্রেমের কিছুটা উত্তরাধিকার পেয়েছিলেন আমার চতুর্থ মামা—মুক্তিযোদ্ধা তোফাজ্জল হোসেন, যাকে আমরা ভেবু মামা বলে ডাকতাম। তিনিও ভালো তবলা বাজাতেন। তাঁর বড় ছেলে তাপস, যিনি এখন ব্রাইটনে থাকেন, তিনিও তবলায় পারদর্শী। মামার বড় মেয়ে শিউলিও সংগীতের সঙ্গে যুক্ত। মনে হয়, নানার সেই সুরের ধারা পরিবারের ভেতর দিয়ে এখনো কোথাও বয়ে চলছে। আমার ছোট কন্যাও নাচ-গানের চর্চা করে। সুরের ধারা পাশাপাশি সাহিত্যিক ধারাও বিদ্যমান। আমার মায়ের জমজ বোন কুসুম খালা, আম্মা তাঁর কয়েক মিনিট পূর্বে পৃথিবীতে এসেছিলেন। কুসুম খালার এক মেয়ে বিউটি, অর্থশাস্ত্রে পিএইডি, বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালক হিসেবে অবসরে। ওর অনেক কাব্য গ্রন্থ ও উপন্যাস আছে।
মহেলা ভুঁইয়া বাড়ির সেই আঙিনাতেই আমার জন্ম। নানার কিছু অভ্যাসও এখনো মনে পড়ে—তিনি ফুরসি হুক্কা টানতেন, আর কখনো কখনো নানীকেও হুক্কা খেতে দেখেছি। নানা একজন আদর্শ কৃষক ছিলেন। সেই দৃশ্যগুলো আজ স্মৃতির ভাঁজে জমে থাকা গ্রামবাংলার এক অন্য সময়ের ছবি হয়ে আছে।
১৯৭১ সালের পর নানা পৌলীতে একটি বাড়ি কিনেছিলেন। বাড়িটির আগের মালিক ছিলেন শ্রীশ চৌধুরী। তিনি বাড়িটি বিক্রি করেছিলেন একটি বিশ্বাস নিয়ে—তাঁর অকালপ্রয়াত পুত্রের স্মৃতিসৌধ এবং তাঁর পিতার স্মৃতিসৌধ, যেগুলো স্থানীয় ভাষায় “মঠ” নামে পরিচিত, সেগুলো যেন সংরক্ষিত থাকে। নানা সেই বিশ্বাস অক্ষুণ্ণ রেখেছিলেন। আজও সেই মঠ আমাদের নানা বাড়িতে দাঁড়িয়ে আছে, অতীতের নীরব সাক্ষী হয়ে।
এই বাড়ির ইতিহাসে আরেকটি আলাদা অধ্যায় রয়েছে। এখানে এক সময় একজন রোমান ক্যাথলিক পুরোহিত—ফাদার ডগলাস—আমাদের নানার দেওয়া জায়গায় একটি দোচালা ঘর তুলে বসবাস করতেন। তিনি ছিলেন অবিবাহিত এবং দীর্ঘদিন সেখান থেকেই মানুষের কল্যাণে কাজ করেছেন। মৃত্যুর পর তাঁকে ময়মনসিংহের রোমান ক্যাথলিক কবরস্থানে সমাহিত করা হয়। যৌবনে ক্যালিফোর্নিয়া থেকে এসেছিলেন।
আমার মেজো মামা, ইরাক থেকে দেশে ফিরে, ওই বাড়িতে একটি ছোট নামাজখানা নির্মাণ করেন। ফলে একই আঙিনায় দাঁড়িয়ে ছিল তিনটি ভিন্ন ধর্মীয় চিহ্ন— নামাজখানা, হিন্দু পরিবারের স্মৃতির দুটি মঠ, আর এক খ্রিস্টান পুরোহিতের থাকার ঘর।
আজ নানা নেই, নানীও নেই, বড় মামাও প্রয়াত। সময়ের স্রোতে বাড়িটিও উত্তরাধিকারদের মধ্যে ভাগ হয়ে গেছে। নতুন নতুন স্থাপনাও উঠেছে সেখানে। কিন্তু পৌলি বাড়ির সেই নামাজখানা, মঠ, আর ডগলাসের দোচালা ঘর এবং সেই স্মৃতিগুলো এখনো আমার মনে। আর মহেলাতে আমি জন্মেছি, সেতো অন্তরে আছেই।
সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই।

এই স্মৃতিচিত্রটি পারিবারিক স্মৃতির ভিত্তিতে লেখা।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পরকীকরণ: মার্কসের তত্ত্বের ভূমিকা

ক্রিস্টাল ফিল্ড তত্ত্ব স ম আজাদ

পণ্যপুঁজা: যুডি কক্স