মার্কসবাদ ও মনোবিজ্ঞান
মূল: সুসান রোজেনদাল অনুবাদ: স ম আজাদ
 
মার্কস ও এঙ্গেলস পুঁজিকে বর্ণনা করেন একটা সম্পর্ক (relationship) হিসেবে এবং পুঁজিতন্ত্রকে গণ্য করেন সম্পর্কাবলীর একটা ব্যবস্থা হিসেবে।
তাঁরা কি মনে করতেন যে আমাদের নিজেদের সাথে, অন্যদের সাথে, এবং সমাজের সাথে আমাদের সম্পর্কাবলীর প্রতিটি দিক পুঁজিতন্ত্র দিয়ে আকার পায়, যেন একটা সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব এই সম্পর্কাবলীর সবগুলো রূপান্তরিত করে?
অথবা সেগুলো কি খুবই সাধারণীকৃত ছিল? মানব অভিজ্ঞতার কিছু দিক কি সমাজ দিয়ে অপ্রভাবিত থাকে, যাতে সেগুলো বুঝতে আমাদের মার্কসবাদ ছাড়া অন্যকিছু দরকার হয় এবং সেগুলোর রূপান্তরে সমাজতন্ত্রের থেকে বেশী কিছু লাগে? এটি হ’ল মার্কসবাদ ও মনোবিজ্ঞানের মধ্যকার বিরোধের মূল (the core of conflict)।
মার্কসীয় পদ্ধতি মানব অভিজ্ঞতাকে বিবেচনা করে সামাজিক-ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের মধ্যে। মনোবিজ্ঞান, মনো-বিশ্লেষণ, মনো-থেরাপি, মেডিসিন, জেনেটিকস এবং অন্য অনেক ডিসিপ্লিন ব্যক্তিগণকে (অথবা তাদের অংশবিশেষকে) বিবেচনা করে সামাজিক প্রেক্ষাপট থেকে পৃথক করে। অনুমান এই যে বৃহত্তর সমাজকে যা নিয়ন্ত্রিত করে তার পরিবর্তে বরং ব্যক্তিগণের (অথবা এর অংশের) মধ্যে বিদ্যমান টেকসই জীববৈজ্ঞানিক বা মানসিক গুণাবলী (biological or psychological qualities) নিয়ন্ত্রিত হয় নানা নিয়ম-কানুন দিয়ে। কাজেই,এই গুণাবলী পরিবর্তন করা যেতে পারে কেবলমাত্র ব্যক্তিগণ বা এর অংশের পর্যায়ে।
ব্যক্তিকে গুরুত্বারোপ করতে  ব্যক্তিকে সমাজ থেকে পৃথক করা হ’ল পুঁজিতান্ত্রিক ভাবাদর্শ, বিজ্ঞান নয়। স্বতন্ত্র নিয়ামকগুলোতে (factors) গুরুত্বারোপ দায়বদ্ধতার ব্যবস্থাকে অব্যাহতি দেয়। এবং যদি ব্যক্তি  যা ঘটে তা পছন্দ করতে পারে, খারাপভাবে পছন্দ করার জন্য তাঁদের অপবাদ দেয়া যেতে পারে, পুনরায় ব্যবস্থাকে দায়মুক্তি দিতে (letting system off the hook)।
বিজ্ঞানীরা আমাদের বলেন যে সমাজ ও ব্যক্তি একে অপরকে গড়ে তোলে গতিশীল মিথষ্ক্রিয়া দিয়ে (dynamic interaction)। যদি একটি বেশী ওজনধারী হয়, তাহলে এর কারণ হ’ল বস্তুগত ও সামাজিক পরিবেশ যা থেকে আমাদের প্রজাতির উদ্ভব ঘটে এবং যা পুঁজিতন্ত্র বিষাক্ত করে।
ক্যান্সারের বিপুল সংখ্যকের কারণ হ’ল পরিবেশগত টক্সিন, যদিও ক্যান্সারাক্রান্তদের দায়ী করা হয় অস্বাস্থ্যপ্রদ পছন্দসমূহ বেছে নেয়ার জন্য এবং “ক্যান্সার ব্যক্তিত্ব” অথবা “ক্যান্সার জিন” ধারণ করার জন্য। একইভাবে, পরকীকরণ মানুষকে মানসিকভাবে অসুস্থ করে, তারপরেও মানসিক অসুস্থতার জন্য দায়ী করা হয় ভুল চিন্তা প্রক্রিয়া, দুর্বল মস্তিষ্ক রসায়ন, অথবা ত্রুটিপূর্ণ জিনসমূহ। ব্যবস্থা তাদের ওপর কি করছে, এর পরিবর্তে ব্যক্তিগণ কি করছে তার ওপর মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করে,এভাবে আক্রান্তকে দোষারোপ করে ব্যবস্থাকে রক্ষা করা হয়।
মানসিক অসুস্থতা বলতে বোঝায় উম্মাদনা (insanity)। ১৯১৮ সনের মানসিক রোগের আমেরিকান সংকলনে (The 1918 American compendium of psychiatric disorders) ২২টি ডায়াগনোস্টিক ক্যাটেগরি ছিল, এর মধ্যে ২১টি ছিল উম্মাদনার বিভিন্ন রূপ। তখন থেকে “মানসিক অসুস্থতার” ক্যাটেগরিকে বেলুনের মত স্ফীত করা হয়েছে যাতে এতে অন্তর্ভুক্ত করা যায় পথভ্রষ্ট ও বিদ্রোহী আচরণগুলোর একটি বিস্তৃত পরিসরকে, তথ্য প্রক্রিয়াকরণের নানা পদ্ধতিকে (neurodiversity), বিচ্ছিন্নতা ও বঞ্চনার (isolation and deprivation) প্রতি আবেগগত সাড়াকে, এবং ট্রমা-সংক্রান্ত লক্ষণসমূহকে। যারা প্রতিবাদ করে, যারা দুর্ভোগ পোহায় এবং যারা উৎপাদনশীলতা ধ্বংস করতে উদ্যত হয়, তাদেরকে মানসিক রোগী হিসেবে চিহ্নিত করতে (pathologise) মানসিক অসুস্থতার বিভিন্ন পর্যায় ব্যবহার করা হয়। সীমাবদ্ধতা শারিরীক অথবা মানসিক যাই হোক না কেন, কম উৎপাদনশীল শ্রমিককে সামাজিকভাবে ত্রুটিপূর্ণ হিসেবে অপবাদ দেয়া হয় এবং কম-বেশী ছাটাইযোগ্য বলে গণ্য করা হয়।
মানসিকভাবে অসুস্থ গণ্যকৃত জনগণই একটি নিপীড়িত গোষ্ঠী গঠন করে। নিপীড়নের অন্য সকল ধরনের মতই, মানসিক অসুস্থতা সকল শ্রেণীর জনগণকে প্রভাবিত করে। যাহোক, নিপীড়নের অন্যান্য ধরনের মতই, বোঝাটা (the burden) বেশীকরে বইতে হয় শ্রমিক শ্রেণীকে। মানসিকভাবে অসুস্থ মানুষটি আইনগত, চিকিৎসাগত, সামাজিক আবাসন বৈষম্যে ভোগে। তাঁদেরকে জোরপূর্বক মাদক প্রদান করা হয় তাঁদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে এবং তাঁদের জীবন সম্পর্কিত সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার অস্বীকার করা হয়। আবদ্ধ বন্দীদের মধ্যে তাঁদের প্রতিনিধিত্ব বেশী এবং তাঁদের বেকার, দরিদ্র গৃহহীন হওয়ার সম্ভাবনা বেশী থাকে।
পুঁজিতন্ত্রে নিপীড়ন অপরিহার্য। নিপীড়িত গোষ্ঠীগুলোকে অধীনস্ত করে একটি ছোট শাসকশ্রেণী সমর্থ হয় একটি অধিকতর বড় শ্রমিকশ্রেণীকে বিভক্ত করতে ও শাসন করতে। বিশেষ করে. মানসিকভাবে অসুস্থকে নিপীড়ন করে সামগ্রিকভাবে সমাজে চিন্তা, অনুভূতি ও আচরণের সঙ্গতিকে নিশ্চিত করতে বাধ্য করে।
অবাধ্যতাকে একটি মানসিক ব্যাধি হিসেবে চিহ্নিত করে সাইকিয়াট্রি পুঁজিতন্ত্রকে সেবা করে। ১৯৫০-এর দশক ব্যাপী সিজোফ্রেনিয়ার লেবেলটি প্রয়োগ করা হত অসন্তুষ্ট গৃহবধুদের ক্ষেত্রে। ১৯৬০-এর দশকের বর্ণবাদ-বিরোধী বিদ্রোহসমূহ DSM-কে (Diagnostic and Statistical Manual of Mental Disorders) তৎপর করে সিজ্রোফ্রেনিয়ার বর্ণনার পরিবর্তনে: প্রাথমিকভাবে বিষন্ন মেজাজ থেকে শত্রুতা, আগ্রাসন এবং নিপীড়নের ভ্রান্তি সবকিছুই সিজোফ্রেনিয়া, এতে শহরতলীর শ্বেতাঙ্গ গৃহবধু থেকে বিদ্রোহী শহুরে কৃষ্ণাঙ্গ পর্যন্ত সবাই আক্রান্ত বলে বিবেচনা করা হয়। বর্তমানে, শ্বেত আমেরিককানদের থেকে তিন গুণ কালো আমেরিকানদের “সিজোফ্রেনিক” বলে চিহ্নিত করা হয় (to be labelled)।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীগণ দাস ও রাজনৈতিক ভিন্ন মতালম্বীদের প্রতিবাদসমূহকে মানসিকভাবে অস্বাভাবিক বলে চিহ্নিত করেন। তাঁরা বিদ্রোহী নারীদের লোবোটমি অপারেশন করে সমকামীতে পরিণত করতে চেষ্টা করতো। “সামাজিকভাবে ত্রুটিপূর্ণ”-দের সহজ মৃত্যু ও বন্ধাকরণের জন্য তারা প্রচারাভিযান চালাতো। তারা জিজ্ঞাসাবাদ ও নির্যাতনে সহায়তা করে। তারা সৈন্যদের মাদক দিতো যাতে তারা হত্যাকান্ড বজায় রাখে। তারা বৃদ্ধ জনগণ ও বন্দীদের মাদক দিতো তাদের শান্ত রাখতে। তারা অবাধ্য শিশুদের মাদক দিতো।
    পরিবারগুলো সংকটে নিমজ্জিত হলে, পিতা-মাতাগণ ছেলেমেয়েদের আবেগগত প্রয়োজনগুলো মেটাতে কম সমর্থ হয়। ছেলেমেয়েদের দুর্দশায় স্কুল অবদান রাখে তাদেরকে বদ্ধ কক্ষে দীর্ঘ সময়ের জন্য আবদ্ধ রেখে যাতে তারা তথ্য মুখস্ত করে যে তথ্যগুলোর সঙ্গে তাদের জীবনের কোনো সংযোগ নেই। যখন ছেলেমেয়েরা অভিনয় করে প্রতিবাদ করে, তখন পেশাদারগণ তাদেরকে মানসিকভাবে ব্যধিগ্রস্ত হিসেবে এবং তাদের পিতামাতাকে অনুপযুক্ত হিসেবে তকমা দেন।
    একবার ছেলেমেয়েদের (মানসিক ব্যধিগ্রস্ত হিসেবে) তকমা দেয়া গেলে, পিতামাতাদের আইনগতভাবে বাধ্য করা যায় তাদের মাদক প্রদান করতে। ২০১৩ সনে ১৭ বছরের নীচের ৮ মিলিয়নের বেশী আমেরিকার ছেলেমেয়েদের সাইকিয়াট্রিক ঔষধের প্রেসক্রিপশন দেয়া হয়েছিলো। এই ছেলেমেয়েদের এক মিলিয়ন ছিল পাঁচ বছরের নীচে, এবং এক মিলিয়নের এক-চতুর্থাংশের বয়স ছিল এক বছরের নীচে। 
    সমাজতন্ত্রীরা নির্যাতিদের পক্ষে দাঁড়ায়। আমরা এই যুক্তি প্রত্যাখ্যান করি যে নারীদের ছেলেমেয়েদের লালন-পালন করা উচিত কারণ তারা জিনগতভাবে লালন-পালনকারী হিসেব প্রোগ্রামকৃত। আমরা এই যুক্তি প্রত্যাখ্যান করি যে কালো জনগণের দরিদ্র হওয়ার সম্ভাবনা বেশী কারণ তারা কম ধীশক্তির অধিকারী। আমরা উপলব্ধি করি যে এ ধরনের জীববিজ্ঞান সংক্রান্ত যুক্তিগুলোর ভিত্তি বিজ্ঞান নয়, এগুলো ছদ্ম-বিজ্ঞান, এগুলো বিজ্ঞানের ছদ্মবেশে প্রচারণা (propaganda)। পুঁজিতন্ত্র ব্যবস্থাগতভাবে বিজ্ঞান ও ছদ্ম-বিজ্ঞানকে গুলিয়ে ফেলে, যা সত্য তা প্রতিস্থাপিত করে যা সত্য বলে দাবী করা হয় তা দিয়ে। ছদ্ম-বিজ্ঞানের একটি উদাহরণ হ’ল এই দাবী যে মানসিক অ্সুস্থতা জীববিজ্ঞানে প্রোথিত (is rooted in biology)।
    মানসিক অসুস্থতার জীববৈজ্ঞানিক মডেল মনকে মস্তিষ্কে রূপান্তরিত করে, যেটি হয়ে দাঁড়ায় গবেষণা ও চিকিৎসার বিষয়। (এই মডেলের একটি প্রকারভেদ (a variation of this model) হ’ল ফ্রয়েদবাদ, যেটি মনকে জনন-ইন্দ্রিয়ে রূপান্তরিত করে (the mind to the genitals)। স্থুল বস্তুবাদকে মার্কসবাদী বস্তুবাদের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়, যেটি মানসিক অসুস্থতাকে দেখে সামাজিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে- পরকায়িত শ্রম দিয়ে অসুস্থকৃত একটি সমাজের ব্যক্তিগত প্রকাশ হিসেবে।
    ঘটনা এই যে সামাজিক শর্তাবলী মানসিক অসুস্থতা তৈরী করে, এটি এতটাই অনিবার্য যে মনোচিকিৎসা শিল্প (psychiatric industry) আমাদের অন্যভাবে বোঝাতো। DSM-এর ১৯৫২ সনের সংস্করণ মানসিক অসুস্থতাকে বর্ণনা করে কিছু বহিস্থ ঘটনা, অবস্থা, অথবা জীববৈজ্ঞানিক শর্তাবলীর (external event, situation, or biological condition)  প্রতি প্রতিক্রিয়া হিসেবে। এই বর্ণনা সরিয়ে দেয়া হয়েছিল সকল পরবর্তী সংস্করণসমূহ থেকে।
   মানসিক অসুস্থতার জন্য একটি বহিস্থ কারণকে চিহ্নিত করার ব্যর্থতা প্রকারান্তরে বোঝায় যে কারণটি হ’ল ব্যক্তির অভ্যন্তরীণ (ত্রুটিপূর্ণ চিন্তা, আচরণ, রসায়ন, অথবা জিনতত্ত্ব), এবং চিকিৎসা হ’ল ভুক্তভোগীকে পরিবর্তন করা, দুর্ভোগের কারণ যে শর্তাবলী তার পরিবর্তন করা নয়। ঔষধ চিকিৎসা ও জিন গবেষণার ওপর ‍গুরত্ব আসে জীববৈজ্ঞানিক মডেল থেকে। এবং তাদের চিন্তাভাবনা, অনুভব ও আচরণ পরিবর্তন করার নির্দেশের অনুশীলন প্রকারান্তরে বোঝায় যে  প্রধান সমস্যা হ’ল রোগীর যথাযথভাবে কাজ করার ব্যর্থতা।
    কেউ কেউ স্বীকার করেন যে উদ্বেগ ও হতাশার মত শিশুর দুর্দশা ও আবেগগত ব্যধির কারণ ঘটায় প্রতিকূল শর্তাবলী, কিন্তু সাইকোসিসের মত নিয়ত ব্যধির অবশ্যি একটি জীববৈজ্ঞানিক কারণ আছে। এটি একটি ত্রুটিপূর্ণ যুক্তি। 
    মানব ধারণা (perception) হ’ল সামাজিকভাবে নির্মাণকৃত। সমাজে আধিপত্য করে যে ধারণাবলী তাই গঠন করে: মানুষ কী চিন্তা করে, তারা কী চায়, তারা কী বিশ্বাস করে, তারা কাদের ভয় করে, তারা কাদের দোষ দেয়, এবং কী গ্রহণযোগ্য এবং গ্রহণযোগ্য নয়। ভুল-ধারণাও সামাজিকভাবে নির্মাণ করা হয়। মনোবিজ্ঞানী, বিজ্ঞাপন পরমার্শক এবং ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞগণ নিয়োগ দেয়া হয় প্রতারণা (“এটি একটি মুক্ত দেশ”), বিরোধ (মানবিক হস্তক্ষেপ হিসেবে যুদ্ধ), জীবন্ত অভিজ্ঞতার অস্বীকৃতি (কঠোর পরিশ্রম সবসময় পুরস্কৃত হয়), এবং হুমকি (কাজ করো অথবা ক্ষুধার্ত থাকো) ভিত্তিক একটি ব্যবস্থা বিক্রয় করতে। অধিকাংশ মানুষ অগ্রহণযোগ্যকে গ্রহণ করে, যদিও তারা এটি পছন্দ করে না। কিছু মানুষ খোলাখুলিভাবে বিদ্রোহ করে। অন্যেরা দৈহিক ও মানসিক লক্ষণসমূহ, আসক্তি ও আত্মহত্যার মাধ্যমে প্রতিবাদ করে। কিছু মানুষ একটি ভিন্ন বাস্তবতায় পলায়ন করে।
    সাইকোসিস সাধারণত বিকশিত হয়  বয়ঃসন্ধিকাল হতে প্রাপ্তবয়সে রূপান্তরের সময়ে, যখন দুনিয়াটা যেমন তার সঙ্গে দুনিয়াটা কেমন হওয়া উচিতের সঙ্গে যে বিরোধ দেখা দেয় তা নিবিড়ভাবে অভিজ্ঞতায় আসে। এই বিরোধ নিষ্পত্তিতে অসমর্থ হয়ে কিছু মানুষ খুবই উদ্বিগ্ন ও গভীর সন্দেহপ্রবণ হয়ে পড়ে। দুনিয়া কোন অর্থ বহন করে না, সুতরাং তারা “বাস্তবতার সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটায়” এবং কল্পনার রাজ্যে  আত্মগোপন করে যেখানে কাল্পনিক উপমাসমূহ (imaginative metaphors) যোগাযোগ সংঘটিত করে যা স্পষ্ট করে বোঝা যায় না। আমরা সকলে আমাদের নিজেদের সাথে কথা বলি, কিন্তু সাইকোসিস নিজের সঙ্গে নিজের সম্পর্কতা বিঘ্নিত করে যাতে অভ্যন্তরীণ কন্ঠস্বরকে ভুলবশত মনে হয় বাইরে হতে আসছে। দৃশ্যমান সংকেতগুলোকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয় যাতে মনে হয় তারা যেন মানুষজন ও বস্তুনিচয়ের আকার ধারণ করে যেগুলো প্রকৃতপক্ষে অস্তিত্বমান নয়।
    জীববিজ্ঞানীগণ ও মনোচিকিৎসকগণ সাইকোসসিসের সামাজিক ভিত্তিকে নাকচ করে দেন। তারা সাইকোটিক ব্যক্তির ঘাটতির চেকলিস্ট তৈরী করেন যা  সংশোধন করতে হবে এভাবে তারা সাইকোটিক আক্রান্ত ব্যক্তির চিকিৎসা করেন। রোগীর অভিজ্ঞতা, প্রেক্ষাপট ও সামাজিক প্রয়োজনকে অস্বীকার করা হয়। কথা (speech), আবেগ (emotion), শরীরের ভাষা (body language) ও আচরণের ধরনের (behaviour pattern) মাধ্যমে একজন মানুষ যোগাযোগের চেষ্টা করে, এই বিষয়গুলোতে মনোযোগ দেয়া হয় না। মস্তিষ্ক রসায়ন, ত্রুটিপূর্ণ জিন মোকাবেলা, এবং আচরণ নিয়ন্ত্রণ- এগুলো নিপুনভাবে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
    মানসিক অসুস্থতার জন্য সবচেয়ে সেরা চিকিৎসা হ’ল সামাজিক সমর্থন (social support)। একটি বৃহদায়তনের আমেরিকান গবেষণা দেখায় যে কম ঔষধ গ্রহণকারী কিন্তু অধিকতর ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সমর্থন পাওয়া মানসিক রোগীরা বেশী ভালো হয় তাদের থেকে যারা সচরাচর ঔষধ-কেন্দ্রীক চিকিৎসা পায়। অস্ট্রেলিয়া, স্ক্যানডিনাভিয়া ও অন্যত্র সামাজিক সমর্থন মডেল সফলভাবে ব্যবহৃত হয়েছে । সামাজিক সমর্থন ধারণার ব্যধিগুলোর (disorder of perception) উপশম ঘটায়, এটি আমাদের বলে যে এই ব্যধিগুলো হ’ল সমাজকে ভিত্তি করে উদ্ভূত।
    সামাজিক স্তরে (on a societal level) মানসিক অসুস্থতার চিকিৎসায় সামাজিক সমর্থনও কার্যকর। গুরুতর মানসিক অসুস্থ গৃহহীন ২০০০-এর অধিক মানুষের ওপর একটি কানাডিয় গবেষণায় দেখা গেছে যে অন্য যে কোনও চিকিৎসার চেয়ে স্থায়ী আবাসন যোগানো অধিকর কার্যকর ছিল।
    জীবন-যাত্রার মান উন্নয়ন প্রকৃতপক্ষে মানসিক অসুস্থতা নিরাময় করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি আট-বছর ব্যাপী গবেষণায় দেখে গেছে যে শিশুরা কোনওদিন দরিদ্র ছিল না তাদের চেয়ে চার ‍গুণের বেশী দরিদ্র শিশুদের মনো-রোগের লক্ষণসমূহ চিহ্নিত হয়েছিলো। গবেষণার মাঝামাঝি সময়ে একটি নতুন গ্যাম্বলিং ক্যাসিনো আর্থিক বোনাস দেয়া শুরু করে তাতে পরিবারগুলোর ১৪% দারিদ্র্য থেকে বের হয়ে আসে।
    যে শিশুরা পূর্বে দরিদ্র ছিল এখন আর দরিদ্র নয়, তাদের মধ্যকার মনোরোগের লক্ষণসমূহ যে শিশুরা কখনও দরিদ্র ছিল না তাদের সম পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। বিপরীতক্রমে, যে শিশুরা এখনও দরিদ্র রয়েছে তাদের মধ্যে মনোরোগের লক্ষণসমূহ খু্‌বই উচ্চ মাত্রায় বিদ্যমান। আয় বৃদ্ধি পিতামাতাদের সামর্থ্যবান করে তোলে তাদের নিজেদের প্রয়োজন মেটাতে, এতে তারা তাদের সন্তানদের চাহিদা মেটাতে আরও সামর্থবান হয়।
    পুঁজিতন্ত্র আরও বেশী মানুষকে সংকটের দিকে ধাবিত করছে। ক্যালিফোর্নিয়াতে পরিষেবাগুলোতে আক্রমণ শ্রমিক শ্রেণীকে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখাতে প্ররোচিত করেছিলো।
    জানুয়ারি ২০১৫-এ ন্যাশনাল ইউনিয়ন অফ হেল্থ ওয়ার্কার্সের (NUHW) ৩,৩০০-এর অধিক সদস্য কাইজার পার্মানেন্টে (Kaiser Permanente) ধর্মঘট করেন। আমেরিকাতে কাইজার পার্মানেন্টে হ’ল সবচেয়ে বড় মেডিক্যাল কর্পোশেন। রেকর্ড পরিমাণ মুনাফা করা সত্ত্বেও, রোগীদের চাহিদা মেটাতে পর্যাপ্ত সংখ্যক কর্মী নিয়োগ দিতে অস্বীকার করে। প্রতিবাদে, NUHW-এর মনোবিজ্ঞানীগণ, থেরাপিস্টগণ, সামাজিক কর্মীবৃন্দ ও সাইকিয়াট্রিক নার্সগণ মানসিক স্বাস্থ্য-কর্মীদের এই সময়ের সবচেয়ে বৃহৎ ধর্মঘট শুরু করেন ৩৫টি নগরে ৬৫টি পিকেট লাইনে।
    সপ্তাহব্যাপী ধর্মঘট পালন করা হয় পিটিশনসহ এবং  No more Kaiser suicides ক্যাম্পেইনে যত্নের অভাবে মৃত্যুবরণকারী রোগীর সংখ্যা প্রচার করা হয়। অবশেষে, একটি উম্মুক্ত ধর্মঘটের হুমকীর সম্মুখীন হয়ে, কাইজার ইউনিয়নের দাবীগুলোতে রাজী হয়। দাবীগুলো হ’ল: রোগীদের জন্য পক্ষ সমর্থনের অধিকার (the right to advocate for patients); মজুরি ও পেনশনের সুরক্ষা; এবং একটি নতুন সিডিউলিং অনুপাত যেটির কারণে রোগীদের আরও বেশী করে দেখা যাবে এবং দাবী পূরণে নতুন নিয়োগের ম্যান্ডেট দেয়। 
    কর্মী ও রোগীদের প্রয়োজনগুলোর সংযোগ একটি অভূতপূর্ব বিজয় এনে দেয়। যাহোক, সেবাসমূহে প্রবেশের চেয়েও আমরা বেশী কিছু চাই। আমরা একটা দুনিয়া চাই যা আমাদের অসুস্থ করে না।
    মানসিকভাবে স্বাস্থ্যবান থাকা পুঁজিতন্ত্রের অধীনে অসম্ভব। প্রতিদিনের দুর্দশা বৃদ্ধি আরও জটিল হয় স্থায়ী যুদ্ধ ও পরিবশগত ধ্বংসের ভয়াবহতা দিয়ে। আপনি যদি আপনার মন খোলা রাখেন পুঁজিতন্ত্রের বর্বরতার দিকে, আপনি মানসিকভাবে আঘাত পাবেন (traumatised)। যদি আপনি আপনার মন বন্ধ রাখেন এর প্রতি, আপনি আপনার মানবতা হারাবেন।
    বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা রিপোর্ট করে যে গত ৪৫ বছরে বৈশ্বিক আত্মহত্যার হার ৬০% বৃদ্ধি পেয়েছে, এতে পুরুষদের সকল ভয়াবহ মৃত্যুর অর্ধেক এবং নারীদের ভয়াবহ মৃত্যুর ৭১% বিদ্যমান। ১৫ হতে ১৯ বছর বয়সের বয়ঃসন্ধিকালীন মেয়েদের মৃত্যুর প্রধান কারণ আত্মহত্যা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৯০-এর দশক হতে ৫-১১ বছরের কালো কিশোরদের আত্মহত্যার হার দ্বিগুণ হয়েছে।
    বিগত ১৫ বছরে হাই স্কুল গ্রাজুয়েটের নেতৃত্বে (headed by) আমেরিকান পরিবারগুলোর মুদ্রাস্ফীতি সমন্বয় করে আয় হ্রাস পেয়েছে ১৯%। এই আয়ের নিম্নগামীতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্বল্প শিক্ষিত সাদা আমেরিকানদের মৃত্যু হারের ২২% বৃদ্ধি, প্রাথমিকভাবে মদ্যপান, মাদকাসক্তি ও আত্মহত্যার কারণে। যদি এই গ্রুপের মৃত্যু হার স্থির রাখা যেতো, তাহ’লে  ৯৬,০০০ মানুষের মৃত্যু পরিহার করা যেতো। যদি এটি এর পূর্ববর্তী হারে হ্রাস পেতো, অর্ধেক নিযুত জীবন বাঁচানো যেতো।
    পুঁজিতন্ত্রের অধীনে অসুস্থতার সামাজিক উৎসসমূহ দূর করা বিকল্প নয়, কারণ মুনাফার প্রবাহে বিঘ্ন ঘটাতে কোনো কিছুকেই অনুমোদন দেয়া হয় না। পরিবর্তে, ব্যবস্থাটি বিষাক্ত পরিবেশের  অধীনে মানুষজনের কাজ করার সামর্থের উন্নতি করতে চেষ্টা করে। এর অর্থ ব্যক্তিগত নিয়ামকগুলোর গবেষণায় এবং এর নিপুন ব্যবহারে বিজ্ঞান, গবেষণা ও দক্ষতাকে সীমিত রাখা। এটি মানসিক অসুস্থতার জন্য যেমন সত্য তেমনি ক্যান্সারের জন্যও সত্য।
মানসিক অসুস্থতা ও ক্যান্সারের কিছু ধরনে রোগী আক্রান্ত হতে পারে ত্রুটিপূর্ণ জীববৈজ্ঞানিক কারণে, কিন্তু তা আমরা নিশ্চিতভাবে জানতে পারি না, এর কারণ হ’ল একটা ব্যবস্থা যেটি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রকে আণবিক পর্যায়ে বিষাক্ত করে। পুঁজিতন্ত্র উচ্ছেদের পরে স্বাস্থ্যবান্ধব সমাজ প্রতিষ্ঠা করার পর, আমরা দেখতে পারি জীববৈজ্ঞানিকভাবে কি নিরাময় করতে হবে। ততক্ষণ পর্যন্ত সমাজতন্ত্রীদের সামাজিক সমস্যার জন্য অবশ্যি গুরুত্ব দিতে হবে যৌথ সমাধানে। তাঁদের এই ভ্রান্তিতে নিপতিত হওয়া যাবে না যে ব্যক্তিগত পর্যায়ে বিজ্ঞানীবৃন্দ ও বিশেষজ্ঞবৃন্দ দ্বারা সেগুলো সমাধান করা যাবে।
    মার্কসবাদ ও মনোবিজ্ঞানের মধ্যকার বিরোধ (conflict) প্রকৃতপক্ষে মনোবিজ্ঞান বা মানসিক অসুস্থতা সম্পর্কে নয়। এটি হ’ল পুঁজিতন্ত্রকে সামাজিক সম্পর্কাবলীর একটি সার্বিক-ঘেরাওকৃত ব্যবস্থা (an all-encompassing system) হিসেবে উপলব্ধি করা, যেখানে সমাজ পরিবর্তনের প্রক্রিয়াতে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা পরিবর্তিত হয়।
    পোল্যান্ডে ১৯৮০-এর দশকে শ্রমিককেরা তাঁদের নিজেদের  দুনিয়ার বৃহত্তম ইউনিয়নে সংগঠিত করেন যাতে অন্তর্ভূক্ত ছিলেন কাজের বয়সী জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ। ধর্মঘট ছড়িয়ে পড়লে এবং বিক্ষোভ বৃদ্ধি পেলে, ভর্তিকৃত শ্রমিকদের দিয়ে পূর্ণ সাইকিয়াট্রিক বেডগুলো খালি হয়ে যায় এবং অসুস্থ সরকারী কর্মকর্তাদের দিয়ে সেগুলো পূর্ণ হয়ে যায়। এটি ঘটে কারণ উর্ধ্বগামী শ্রেণী সংগ্রাম ব্যক্তিগত সমস্যাগুলো যৌথভাবে সমাধানের দুয়ার খুলো দেয়।
    শ্রমিক শ্রেণীর দশকের পর দশক পশ্চাদপশরণ (retreat) যৌথ সমাধানের ওপর আস্থা হ্রাস করেছে। সমাজতন্ত্রীরাও এই মনোভঙ্গ (discouragement) থেকে মুক্ত নয়। যে সমাজে ব্যক্তি-স্বাতন্ত্রবাদ (individualism) আধিপত্য করে এবং “ইতোমধ্য” সংস্কারবাদীদের “হ্যাঁ-তবে অবস্থান ব্যক্তিগত সমাধান উৎসাহিত করে, সেই সমাজে শ্রেণী সমাধানের উত্থাপন খুবই কষ্টকর। কোনও ইতোমধ্যে নেই। আমাদের উদ্বর্তন এখন নির্ভর করে শ্রমিক শ্রেণীর সঙ্গে সমাজতান্ত্রিক ঐতিহ্যের সংযোগে। 
    নিপীড়ন পুঁজিবাদের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং এর বিরুদ্ধে লড়াই অবশ্যই সমাজতন্ত্রের সংগ্রামের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য হতে হবে। অধিকতর ভালো কর্ম-পরিবেশ ও বেঁচে থাকার  পরিবেশের জন্য সংগ্রামের প্রক্রিয়াতে আমাদের মানসিক স্বাস্থ্য গড়তে হবে। শ্রেণী সংহতি গড়ার প্রক্রিয়াতে আমাদের মানসিক স্বাস্থ্য গড়তে হবে, একটা সমাজতান্ত্রিক সমাজের জন্য ভিত্তি স্থাপন করতে যে সমাজ ধাবিত হবে প্রত্যেকের সামর্থকে নিয়োজিত করতে এবং প্রত্যকের প্রয়োজন মেটাতে।
 
 
 
 
     
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পরকীকরণ: মার্কসের তত্ত্বের ভূমিকা

ক্রিস্টাল ফিল্ড তত্ত্ব স ম আজাদ

পণ্যপুঁজা: যুডি কক্স