চার্লস ডারউইন ও বিবর্তনবাদ স ম আজাদ

 


চার্লস ডারউইন ও বিবর্তনবাদ

স ম আজাদ

 

আমাদের গ্রহ জীব-বৈচিত্রে ভরপুর। প্রায় ১.৫ মিলিয়ন প্রজাতির নামকরণ করা হয়েছে। মিলিয়নের অধিকের অস্তিত্ব আছে বলে ধারণা করা হয়। এই প্রজাতিসমূহ কোত্থেকে এসেছিল? এগুলো কি আলাদাভাবে সৃষ্টি করা হয়েছিল, নাকি প্রজাতিগুলো পরিবর্তিত হয়ে নতুন প্রজাতির উদ্ভব সম্ভব করেছিল, ১৮৫৯ সালে চার্লস ডারউইনের জগৎ বিখ্যাত গ্রন্থ On the Origin of Species by Means of Natural Selection প্রকাশের পূর্বে জানা ছিল না। তাঁর এই গ্রন্থটি লেখা সম্ভব হয়েছিল তাঁর বিগল জাহাজে পাঁচ বছরব্যাপী প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা থেকে।

বিগল জাহাজে সমুদ্র ভ্রমণ

সম্পদশালী চিকিৎসকের পুত্র ছিলেন চার্লস ডা্রউইন। ‍তিনি মনোযোগী শিক্ষার্থী ছিলেন না, স্কুলের থেকে বাইরে বেশী সময় কাটাতেন। এডিনবার্গের মেডিক্যাল ছাত্র হিসাবে তাঁর সময়টা সুখকর ছিল না। সেই যুগে এ্যানাসথেটিক ছাড়া অপারেশন দেখে তিনি ভীত-সন্ত্রস্ত হয়েছিলেন। তিনি ক্লাস লেকচার বাদ দিয়ে বায়োলজিক্যাল স্পেসিমেন (biological specimen) সংগ্রহে দুই বছর কাটিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর পিতা তাঁকে ক্যামব্রিজে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন যেন তাঁর সন্তান পাঠ শেষে মন্ত্রী হতে পারে। কিন্তু ১৮৩১ সনে তিনি গ্রাজুয়েট হয়ে বিগল জাহাজে অবৈতনিক প্রকৃতিবিদ হিসেবে যাত্রা শুরু করেন। বিগল অভিযানকালে তিনি তাঁর সময়ের অন্যান্য বিজ্ঞানীদের মতই বিশ্বাস করতেন যে ঈশ্বর সমস্ত জীব-বৈচিত্র সৃষ্টি করেছেন এবং প্রজাতিসমূহ অপরিবর্তনশীল। তাঁর অভিযানকালে পশু, উদ্ভিদ ও ফসিলের নমুনা সংগ্রহের জন্য ডারউইন মাঝে মাঝেই জাহাজ থেকে নেমে যেতেন এবং এগুলো তিনি জার্নালে রেকর্ড করতেন। ১৮৩৬ সনে ডারউইন বিগল জাহাজের অভিযাত্রা শেষে ইংল্যান্ডে ফিরে আসেন। প্রজাতিসমূহ অনড়, স্থির ও  অপরিবর্তনীয়- এই ধারণার প্রতি তাঁর সংশয় দানা বাঁধে বিগল জাহাজে তাঁর পাঁচ বছরব্যাপী অভিযানের ফলে।

বিগল জাহাজে অভিযানকালে ডারউইন আমেরিকার প্যালাপ্যাগোস দ্বীপপুঞ্জে অবতরণ করেন। ইকুয়েদর উপকূল থেকে ১০০০ কিলোমিটার পশ্চিমে এটি অবস্থিত। তিনি এখানে ফিঞ্চ (Finch) পাখীর কিছু প্রজাতির নমুনা সংগ্রহ করেন। এই সবগুলো প্রজাতিই অনুরূপ, কিন্তু খাদ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে এরা বৈশিষ্ট্যমূলকভাবে পৃথক। এটি প্রতিভাত হয় পাখীর ঠোঁটের গঠনের পার্থক্য থেকে। কিছু পাখীর চঞ্চু পুরু ও মজবুত, এতে এদের শক্ত ও কঠিন বীজ ভেঙ্গে খেতে সুবিধা হয়। অন্যদের ছিল সরু ঠোঁট যাতে এরা পোকা-মাকড় সহজেই ধরতে পারে।

কিন্তু দক্ষিণ আমেরিকার একটিমাত্র প্রজাতির সাথেই এই দ্বীপের সবগুলো ফিঞ্চ পাখীর প্রজাতির নৈকট্য ছিল। বাস্তবত গ্যালাপ্যাগোস দ্বীপপুঞ্জের সব উদ্ভিদ ও প্রাণীর সাদৃশ্য ছিল নিকটবর্তী দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলের উদ্ভিদ ও প্রাণীর সাথে। কেনই বা এই সাদৃশ্য? ডারই্‌উন চিন্তা করলেন যে অতীতে কিছু জীবন্ত সত্তা (organism) গ্যালোপ্যাগোস দ্বীপপুঞ্জে অভিবাসিত হয়েছিল। নতুন আবাস ভূমিতে বছরের পর বছর অতিবাহিত করতে যেয়ে স্বল্প কয়েক প্রকারের উদ্ভিদ ও প্রাণী পরিবর্তিত হয়ে নতুন প্রজাতির উদ্ভব ঘটিয়েছিল। সময়ের সাথে সাথে প্রজাতির এই পরিবর্তনকেই বিবর্তন বলে।

বিবর্তনের প্রমাণ

১৮৮২ সনে ডারউইনের মৃত্যুর পর শতাধিক বছর অতিবাহিত হল। এই সময়ে বির্বতন তত্ত্বের সপক্ষে বিপুল পরিমাণ নতুন নতুন প্রমাণ সংগৃহিত হয়েছে। এই প্রমাণসমূহের নায্য উৎসের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে জীবাশ্মের গবেষণা, জীবন্ত সত্তাসমূহের (organisms) গাঠনিক তুলনা এবং DNA ও প্রোটিন সম্পর্কিত দ্রুত বর্ধনশীল জ্ঞান।

এক প্রজাতি হতে অন্য প্রজাতিতে রূপান্তরে হাজার হাজার বছর অতিবাহিত হয়। বিবর্তনের এই সময়ে মধ্যবর্তী রূপ (intermediate form) পুরাতন প্রজাতির সাথে নতুন প্রজাতির সম্পর্ক স্থাপন করে। The Origin of Species প্রকাশের সময় ডারউইন এ ধরণের কোন মধ্যবর্তী রূপের সন্ধান পাননি। তিনি এটিকে তাঁর যুক্তির অন্যতম দুর্বলতা বলে চিহ্নিত করেন। কিন্তু তিনি সঠিকভাবে অনুমান করেন যে এই রূপটি পাওয়া যেতে পারে জীবাশ্ম রেকর্ডে। এখন আমরা অনেক ভাল ভাল উদাহরণ জানি। যেমন, ‍আধুনিক তিমি. ঘোড়া ও গরুর পূর্বপুরুষ এ্কই এবং সেটি হচ্ছে খুরবিশিষ্ট চতুস্পদী স্থলজ প্রাণী। আধুনিক তিমি এবং এর ৬০ মিলিয়ন বছর পূর্বের পূর্বপুরুষের মধ্যকার জীবাশ্ম মধ্যবর্তীসমূহ (fossil intermediates) ধীর রূপান্তরের ইতিহাস প্রদর্শন করে। সময়ের সাথে সাথে পেছনের পা দুটি খর্বাকৃতি হতে হতে একসময় লুপ্ত হয়ে যায়। তাই আধুনিক তিমির শ্রোণী (pelvis) আছে, কিন্তু পশ্চাদভাগে কোন পা নেই। জীবাশ্ম পর্যবেক্ষণ থেকে যে বিস্তারিত চিত্র পাওয়া যায় তাতে এটি সুস্পষ্ট যে তিমির বিবর্তনের কেন্দ্রীয় বৈশিষ্ট্যিই হচ্ছে পেছনের পা দুটির ক্রমাগত আকৃতি হ্রাস।

যে সমস্ত প্রজাতির একই পূর্বপুরুষ বিদ্যমান, তাদের ক্ষেত্রেই অনুরূপ অঙ্গসমূহ দেখা যায়, এই অঙ্গগুলোকে সমগোত্রীয় অঙ্গ (homologous structures) বলে। সমগোত্রীয় অঙ্গগুলো অনুরূপ, কারণ তাদের একই সাধারণ পূর্ব পুরুষের অঙ্গের রূপান্তরিত রূপ হচ্ছে এই অঙ্গ। মানুষের হাত স্পষ্টত পাখীর ডানা এবং ডলফিনের সামনের ডানা থেকে পৃথক। এই ডানাসমূহের অস্থিগুলোর অবস্থান ও বিন্যাস পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় যে এগুলো অনুরূপ। জীববিজ্ঞানীগণ বলেন যে এই বাহুগুলো সমগোত্রীয় (homologous)। উড্ডয়ন, সাঁতার ও কোনকিছু ধরার কাজে উপযোগী হলেও উপরোল্লেখিত প্রাণীসমূহের বাহুগুলো হচ্ছে তাদের একই পূর্বপুরুষ মাছের সম্মুখের ডানাসমূহ। কাজেই আমরা বিভিন্ন বৈচিত্রময় প্রজাতিসমূহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গসমূহ তুলনা করে বিবর্তনের প্রমাণ পেতে পারি।

আমরা সাবমেরিনের নকসাতে চাকা অন্তর্ভূক্ত করি না। সাবমেরিনে চাকার কোন কাজ নেই। কিন্তু জীবন্ত-সত্তাসমূহে কাজ নেই এমন কিছু অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দেখা যায়, এদেরকে অবশেষ অঙ্গ (vestigial structure) বলে। যেমন, তিমি সাঁতার কাটে এর সবল লেজের সাহায্যে এবং এর কোন পশ্চাৎ-বাহু বা শ্রোণীর দরকার নেই। তবুও তিমির খর্বাকৃতির শ্রোণী আছে যার বাহ্যত কোন কাজ নেই, এটি তিমির vestigial structure, যা তিমির বিবর্তনীয় অতীতের অবশেষ। চারপেয়ে, স্থলজ, স্তন্যপায়ী প্রাণী থেকে তিমিতে বিবর্তনের প্রমাণ হচ্ছে এর শ্রোণী। vestigial structure হচ্ছে বিবর্তনীয় অতীতের সাথে যোগসূত্র। জীবন্ত সত্তাসমূহের সম্পূর্ণ জীবাশ্ম অতীত বিরল হলেও এদের ডিএনএ মধ্যস্থিত নিউক্লিয়োটাইডসমূহের অনুক্রমে (sequence of nucleotides) এদের ইতিহাস লেখা থাকে। ডিএনএ হল একটি ডাবল হেলিক্স, পরস্পরের সাথে পাকানো দুটি দড়ি যা দেখতে সর্পিলাকার মইয়ের মত। আর মানুষেরটি হল এক বিলিয়ন  নিউক্লিয়োটাইডের দৈর্ঘ্যের সমান একটি মইয়ের মত। সময়ের সাথে সাথে প্রজাতি রূপান্তরিত হলে তাদের জিনও পরিবর্তিত হবে। এতে জিনের নিউক্লিয়োটাইড অনুক্রমেও অধিক পরিবর্তন সাধিত হয়। বেশ কিছু প্রজাতির জিন তুলনা করলে দেখা যায় যে নিকট সম্পর্কের প্রজাতির জিনের নিউক্লিয়োটাইড অনুক্রমে অধিক সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়, আর দূরবর্তী সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই সাদৃশ্য কম হয়। নিকট সম্পর্কের প্রজাতিগুলোর প্রোটিনগুলোতে অ্যামিনো এসিডসমূহের অনুক্রমেও অধিক সাদৃশ্য দেখা যায়। এর কারণ প্রোটিনের অ্যামিনো এসিড্ অনুক্রম ঐ প্রোটিনের জন্য জিন কোডিংয়ের নিউক্লিয়োটা্ইড অনুক্রমকে প্রতিফলিত করে। যেমন, মানুষের সঙ্গে শিমপাঞ্জি, কুকুর ও rattlesnake কতটুকু নিকট সম্পর্কযুক্ত তা বুঝতে বিজ্ঞানীরা প্রোটিন সাইটোক্রোম c-এর অ্যামিনো এসিডের অনুক্রম পরীক্ষা করেন। তাঁরা দেখেন যে মানুষের সাইটোক্রোম c ও সিমপাঞ্জির সাইটোক্রোম c-এ মোট ১০৪টি অ্যামিনো এসিড একই রকম। সিমপাঞ্জির সঙ্গে মানুষের নিকট আত্মীয়তার সূচক এই উচ্চমাত্রার সাদৃশ্য। মানুষের সাইটোক্রোম c-এর সাথে কুকুরের সাইটোক্রোম c-এর পার্থক্য বিদ্যমান ১৩টি অ্যামিনো এসিডে, এটি নির্দেশ করে যে কুকুর আমাদের মোটামুটি দূরবর্তী আত্মীয়। কিন্তু rattlesnake-এর থেকে কুকুর আমাদের নিকটবর্তী, কারণ rattlesnake-এর সাইটোক্রোম c-এর সঙ্গে মানুষের সাইটোক্রোম c-এর পার্থক্য ২০টি অ্যামিনো এসিডে। যাহোক, অধিকাংশ ক্ষেত্রে ডিএনএ বা প্রোটিন অনুক্রম দ্বারা নির্দেশিত বিবর্তনীয় আত্মীয়তা তুলনামূলক এনাটমি ও বিকাশমান প্যাটার্ন দ্বারা প্রস্তাবকৃত বিবর্তনীয় আত্মীয়তাকে নিশ্চয়তা দেয়।

প্রাকৃতিক নির্বাচন-বিবর্তনের কৌশল

বিবর্তনের কৌশল বা কার্যসাধন পদ্ধতি হল প্রাকৃতিক নির্বাচন। এই মহান আবিষ্কারের সাথে ডারউইন ছাড়াও আর একজন মহান বিজ্ঞানী আলফ্রেড রাসেল ওয়ালেসের নামও জড়িত। তাঁরা বললেন যে প্রকৃতি হল উর্বর, এতে বিপুল সংখ্যক উদ্ভিদ ও প্রাণী জন্ম নেয়, কিন্তু টিকে থাকে তার চেয়ে কম সংখ্যক। কারণ, প্রকৃতি কেবলমাত্র দৈবক্রমে টিকে থাকার জন্য অধিক যোগ্যতাসম্পন্ন প্রজাতিসমূহকেই নির্বাচিত করে। বংশগতির হঠাৎ পরিবর্তনকে পরিব্যাপ্তি (mutation) বলে, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পূর্ববর্তী প্রজাতির বৈশিষ্ট্য পরবর্তী প্রজাতির মধ্যে সঞ্চারিত হয়। এরা বিবর্তনের কাঁচামাল সরবরাহ করে। প্রকৃতি নির্বাচন করে সেইসব মিউটেশনকে যেগুলো বৃদ্ধি করে অস্তিত্বের সম্ভাবনাকে। এতে    “একটি প্রাণ-রূপ থেকে অন্য প্রাণ-রূপে ধীর রূপান্তরের মাধ্যমে সম্পন্ন হয় নতুন প্রজাতির উদ্ভব।” সংক্ষেপে এটিই হল প্রাকৃতিক নির্বাচন।

এখন কথা হল, প্রাকৃতিক নির্বাচন আমাদের সরাসরি প্রভাবিত করে কিনা? হ্যাঁ, করে। কারণ, আমাদের শরীরের গড়ন পায় প্রাকৃতিক নির্বাচন দিয়ে। যেমন, আমাদের চোখের ফোকাসের ক্ষমতা, যেভাবে আমাদের হাত কোন বস্তুকে আঁকড়ে ধরে, আমাদের ঋজু অঙ্গ-সংস্থিতি, আমাদের বিকশিত মগজ, আমাদের চুলের রঙ, এবং অন্যান্য আরও বৈশিষ্ট্যের সবই হল প্রাকৃতিক নির্বাচন দ্বারা বিবর্তনের ফল।

যেহেতু ডারউইন বিবর্তনের জন্য কৌশল ও প্রমাণ উপস্থাপন করেন, কাজেই তাঁর যুক্তিসমূহ এবং দৃষ্টিভঙ্গি শীঘ্রই দুনিয়াব্যাপী জীববিজ্ঞানীগণ গ্রহণ করেন। ঊনিশ শতকের প্রথম দিকে মেন্ডেল কর্তৃক জেনেটিক্স-এর ধারণাবলী আবিষ্কৃত হলে এর মূলনীতিসমূহ ডারউইনের ধারণাবলীতে প্রয়োগ করা হয়, এভাবেই বিবর্তনের আধুনিক তত্ত্ব বিকশিত হয়।

টাঙ্গাইল থেকে প্রকাশিত সা্প্তাহিক পূর্বাকাশ, ১০ই জুন, ২০০৭ সংখ্যায় মুদ্রিত।

 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পরকীকরণ: মার্কসের তত্ত্বের ভূমিকা

ক্রিস্টাল ফিল্ড তত্ত্ব স ম আজাদ

পণ্যপুঁজা: যুডি কক্স