অমৃতসরের স্বর্ণ মন্দিরে অপারেশন ব্লু স্টার এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ভূমিকা



অমৃতসরের স্বর্ণ মন্দিরে অপারেশন ব্লু স্টার
এবং
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ভূমিকা
মূল: রাহুল প্যাটেল           অনুবাদ: স ম আজাদ


ভারতের স্বাধীনতার প্রায় ৪০ বছর পরে ব্রিটেনের গোয়েন্দা সংস্থা SAS ভারতে সেনাবাহিনীর একটি হত্যাযজ্ঞের পরিকল্পনায় সহায়তা করে। ৩০ বছর নিয়মের অধীনে ব্রিটিশ বৈদেশিক দপ্তর গোপনীয় নথিসমূহ প্রকাশ করে, তাতে এই পরিকল্পনাটি উম্মোচিত হয়। সেগুলো দেখায় যে ভারত সরকার অমৃতসরে অবস্থিত স্বর্ণমন্দির থেকে শিখ চরমপন্থীদের অপসারণ করতে ব্রিটিশ পরমার্শ  চায়। বৈদেশিক দপ্তর এতে সারা দেয় পক্ষপাতমূলকভাবে এই শর্তে যে ব্রিটিশ ভূমিকা কঠোরভাবে গোপন রাখা হবে। নথিপত্রগুলো থেকে বুঝা যায় যে তখনকার বিট্রিশ প্রধান মন্ত্রী SAS এর জড়িত থাকার ব্যাপারে সম্পূর্ণ অবহিত ছিলেন। পরিকল্পনাটি ছিল অপারেশন ব্লু স্টার। পাঞ্জাব রাজ্যের অমৃতসরে অবস্থিত শিখ ধর্মের পবিত্রতম জায়গা স্বর্ণ মন্দিরে ট্যাংক ও হেলিকপ্টার যোগে সেনা অভিযান পরিচালিত হয়। এই অভিযানটি ছিল রক্তাক্ত এবং এতে হাজার হাজার মানুষ মারা যায়। ১৯৮৪এর ৩১ অক্টোবরের হত্যাকান্ডের পরে ভারতীয় প্রধান মন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে তাঁর শিখ দেহরক্ষী হত্যা করে।

পরবর্তী ৫ বছরে গণহত্যায় প্রায় ৮,০০০ শিখ নিহত হন। এই গণহত্যাটি পুলিশ ও কংগ্রেস নেতৃবৃন্দের প্ররোচনায় সংঘটিত হয়। কেবলমাত্র রাজধানী নয়া দিল্লীতে প্রায় ৩,০০০ শিখকে হত্যা করা হয়। অধিকাংশ শিখ নানা সমাজে বসবাস করতো। সুতরাং শিখদের চিহ্নিতকরণে কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ আক্রমণকারীদের ভোটার তালিকা, স্কুল রেজিস্ট্রেশন ফরম এবং রেশনের তালিকা সরবরাহ করে। তারা রাতে শিখদের বসবাসরত বাড়িঘর “S” দিয়ে চিহ্নিত করে। ভোরবেলা দাঙ্গাকারীরা বাড়ি থেকে শিখদের বের করে আনে আক্রমণের উদ্দেশ্যে। তারা তাদের ওপর গাড়ির টায়ার ছুঁড়ে মারে, পেট্রোল ঢেলে দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়।
 
ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর পরে তাঁর পুত্র রাজিব গান্ধী ক্ষমতা গ্রহণ করেন। হত্যাযজ্ঞ সম্পর্কে তিনি বলেন, যখন একটি বড় বৃক্ষ পতিত হয়, তখন দুনিয়া কেঁপে উঠে। ইন্দিরা গান্ধী এক দশকের ওপর ভারতীয় রাজনীতিতে প্রাধান্য বিস্তার করেছিলেন। ১৯৭০এর দশকে তাঁর এবং কংগ্রেসের ধারণা অনুযায়ী অভ্যন্তরীণ শত্রæর বিরুদ্ধে  তিনি দেশকে নেতৃত্ব দেন একটি যুদ্ধ সংঘটনে। ১৯৭১এ পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধে সফলতার ওপর ভর করে ইন্দিরা গান্ধী বিপুলভাবে ভোটে জয়ী হন।

কিন্তু ১৯৭৩এর বিশ্ব তেল সংকট এবং  এর সঙ্গে যুদ্ধের বিপুল ব্যয়ভার এবং ভারতের নিম্নাভিমুখী শিল্পোৎপাদন, একটি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটের সৃষ্টি করে। ১৯৭৫এ ভারতীয় হাইকোর্ট নির্বাচনী অনিয়ম দেখতে পায় এবং ১৯৭১এর নির্বাচনকে আইনত নির্বল ও বাতিল বলে রায় দেয়। টাটার মতন প্রধান শিল্পপতিদের সমর্থনে ইন্দিরা গান্ধী এবং তাঁর কংগ্রেস পার্টি  জরুরী অবস্থা জারি করে। জরুরী অবস্থা জারি রাখতে ইন্দিরা গান্ধী বিরোধীদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রাখেন।
 
অ্যামেনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলে যে প্রায় ১৪,০০০ জন বিরোধী কর্মীদের বিনাবিচারে জেলে ঢোকানো হয়, এতে অন্তর্ভুক্ত ছিলো ট্রেড ইউনিয়ন কর্মীবৃন্দ যারা ধর্মঘট ও বিক্ষোভ সংঘটিত করেন। সংবাদপত্র ও রাষ্ট্রীয় রেডিও-টেলিভিশনে সেন্সর আরোপ করা হয়। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস সংবাদপত্র বিশ্ব প্রেসের নিকট একটি রাজনৈতিক পয়েন্ট তুলে ধরে খালি কলাম ছেপে এটা দেখাতে যে রাষ্ট্র কীভাবে সংবাদপত্রগুলোকে সেন্সর করে।

কংগ্রেস পার্টি গ্রামীণ জনগণের একটি অংশের মধ্যে বাধ্যতামূলক বন্ধাকরণের কর্মসূচীর অভিযানে নেতৃত্ব দেয়। প্রধান মন্ত্রীর পুত্র সঞ্জীব গান্ধী বলেন যে ভারতে জনসংখ্যা হ্রাস ও দারিদ্র্য দূরীকরণের জন্য এটাই সমাধান। জরুরী অবস্থার সময় পূর্ববর্তী বছরের চেয়ে বন্ধ্যাকরণ ২.৭ মিলিয়ন পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। পুরাতন দিল্লীতে বস্তি ও নিম্ন আয়ের  আবাসনগুলো ধ্বংস করা হয়, এবং বিনা বিচারে বন্দী এবং রাজনৈতিক বন্দীদের ওপর নির্যাতন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। ব্যাপকমাত্রায় গণ অমান্যতা (civil disobedience দেখা দেয়, কিন্তু এটি দ্রæত গণ গ্রেফতার ও ভীতি প্রদর্শন (intimidation) করে দমন করা হয়। তারপরেও শিখদের বিরোধীতা শক্তিশালী থাকে। কিছু কিছু এলাকায় যেমন নতুন দিল্লীতে প্রতিমাসে পূর্ণিমার সময় শিখরা বাইরে বেরিয়ে আসতো এবং গণগ্রেফতারের  কবলে পড়তো।

ঐতিহাসিক

শিখ সংগঠনসমূহ জরুরী অবস্থার বিরুদ্ধে তাঁদের সংগ্রামকে সংযুক্ত করে মোগল সম্রাট ও ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে তাঁদের ঐতিহাসিক সংগ্রামের সাথে। কিন্তু তাঁদের বিরোধীতা ছিল ১৯৬০এর দশকে সবুজ বিপ্লব পরীক্ষণের জের। এটি ভারতীয় কৃষিতে খাদ্য উৎপাদনের পরিমাণ বৃদ্ধি করে। কিন্তু এটি ব্যাপক সংখ্যায় ক্ষুদ্র চাষীদের উৎখাত করে বড় বড় পুঁজিবাদী খামার দ্বারা। এই খামারগুলো নির্ভর করে রাজনৈতিক দূর্নীতি এবং বহুজাতিক কোম্পানিসমূহের ওপর, যারা ব্যাপক সংখ্যায় সার ও রাসয়ানিক শিল্প-কারখানা স্থাপন করে। এগুলোর মধ্যে একটি ছিল ভুপালে অবস্থিত মার্কিন ফার্ম ইউনিয়ন কার্বাইডের কীটনাশক প্ল্যান্ট। অপারেশন ব্লু স্টারের ছয় মাস পরে এই প্ল্যান্টে দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়। এতে বিষাক্ত গ্যাস নির্গত হয়ে প্রায় আট হাজার জন মানুষ মৃত্যুবরণ করেন মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে। প্রধান খাদ্য উৎপাদনকারী রাজ্য পাঞ্জাব ও হরিয়ানায় সবুজ বিপ্লবে বড় রকমের পালাবদল ঘটে। এই রাজ্যদুটিতে শিখ জনগোষ্ঠী সংখ্যাগরিষ্ঠ।

একুশ মাস পরে জরুরী অবস্থা প্রত্যাহার করা হয়। ১৯৭৩এ অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে কংগ্রেস পার্টি বিজয়ী হবে বলে প্রত্যাশা করেছিল। কিন্তু বিরোধী দলীয় কোয়ালিশন কংগ্রেসকে ধরাশায়ী করে। ইন্দিরা গান্ধী ও সঞ্জীব গান্ধী তাদের আসন হারান। কিন্তু শাসক কোয়ালিশন তাদের শাসনকালে বিভক্ত হয়ে পড়ে। কংগ্রেস পার্টি সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ১৯৮০এ আবার ক্ষমতায় আসে।
 
বিরোধী শিখেরা ইন্দিরা গান্ধীর ভাবমূর্তির যে ক্ষতি করেন, তা তিনি ভুলেননি। পাঞ্জাবে তার নীতির বিরোধীরা সবল ছিল। স্বাধীন শিখ রাষ্ট্র খালিস্তানর জন্য একটি বর্ধিঞ্চু বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন শুরু হয়। ১৯৮২তে এই আন্দোলনের সশস্ত্র অনুসারীগণ স্বর্ণমন্দির কমপ্লেক্সের কিছু জায়গায় অবস্থান নেয়।

১৯৮৪ নাগাদ রাষ্ট্র কারফিউ জারি করে এবং জনগণের চলাচল স্থগিত করে এই বিরোধীতাকে উৎখাতের সিদ্ধান্ত নেয়। এটি বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে স্বর্ণ মন্দিরে সম্পূর্ণ ব্ল্যাক আউট সৃষ্টি করে। রাষ্ট্র গণমাধ্যমে সম্পূর্ণ সেন্সর আরোপ করে। সেনাবাহিনী পাঞ্জাবের গ্রামগুলোতে সাত ডিভিশন সৈন্য পাঠায়। তারপর ঐতিহাসিক ভবনগুলোতে ও দীঘিসমূহে বোমা বর্ষণ শুরু করে। সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশ নিতে ৫০,০০০ শিখ অমৃতসর থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে জমায়েত হয়, আরো ২০,০০০ শিখ অন্যান্য জায়গায় জমায়েত হয়। সেনা হেলিকপ্টারগুলো বৃহদায়তনের  জনসমাবেশগুলো চিহ্নিত করে, এবং জেনারেলগণ ট্যাংক ও আক্রমণ যান (assault vehicles) প্রেরণ করে। হাজার হাজার শিখকে হত্যা করা হয়। এটি শেষ হয় স্বর্ণ মন্দির আক্রমণে।

এরপর বিভিন্ন জায়গায় প্রায় ৪০,০০০ শিখ সৈন্য বিদ্রোহ করে। বলা হয়ে থাকে যে তাদের নিয়ন্ত্রণাধীনে আনতে সুসংবদ্ধ যুদ্ধ করতে হয়েছিল। ১৯৮৪এর সেপ্টেম্বর নাগাদ চাপের মধ্যে স্বর্ণ মন্দির থেকে সেনা প্রত্যাহার করা হয়। অবশেষে কংগ্রেস এর সার্কেলসমূহে শিখদের কোঅপ্ট করতে বাধ্য হয়। বর্তমান প্রধান মন্ত্রী মনোমোহন সিংহ এই বছরের নির্বাচনে ইন্দিরা গান্ধীর নাতি রাহুল গান্ধীর পক্ষে অবসর নিচ্ছেন। তিনি একজন শিখ।
         
 এটাও খুব বেশী দিনের কথা নয় যখন কংগ্রেসের বেয়াড়া, গোঁড়া গুন্ডাপান্ডা এবং এদের চেলাচামুন্ডারা ভারতের মুসলমানদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এদের পছন্দের বলির পাঠা হিসেবে।

স্বাধীনতার পরেও চলমান ব্রিটিশ পদ্ধতি

আর একটি অমৃতসর হত্যাযজ্ঞের পায়ে হাটা দূরত্বের মধ্যে ১৯৮৪তে স্বর্ণ মন্দিরে আক্রমণ সংঘটিত হয়। ব্রিটেন তার ঔপনিবেশিক শাসন রক্ষার্থে ১৯১৯এ ব্রিটিশ সেনাবাহিনী মেশিনগানসহ শত শত নিরস্ত্র জনতাকে কঁচুকাটা করে। সম্প্রদায়সমূহের মাঝে বিভেদ নীতি এবং নিষ্ঠুর সামরিক নীতি Ñ এই দুটি কৌশল প্রয়োগ করে ব্রিটেন ভারত শাসন করে। একটা মিথ ছিল এই যে স্বাধীনতার পরে এর নেতা মহাত্মা গান্ধীর নীতিমালা অনুসরণ করে ভারত হবে একটি শান্তিপূর্ণ দেশ। কংগ্রেসের নেতৃত্বে ভারতীয় শাসকগোষ্ঠী ব্রিটিশ শাসনাধীনে সৃষ্ট  ও পরিপুষ্ট রাষ্ট্র এবং রাজনীতিকে ধ্বংস করেনি। বরং এরা ব্রিটিশ যন্ত্র নিজেদের প্রয়োজনে রেখে দিয়েছে। ১৯৮৪এর হত্যাযজ্ঞের সময়ে ব্রিটিশ সরকার বিনিময়ে ভারতের নিকট অস্ত্র বিক্রিয় করতে চায়, এবং মোলায়েমকারক হিসেবে শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিরুদ্ধে এর সমর্থন ছুঁড়ে দিয়ে। ইতোমধ্যে ভারত সরকার এর অর্থনৈতিক সমস্যাবলী সমাধানে ব্রিটেনের নিকট ঋণের জন্য হাত বাড়িয়ে দেয়।

সর্বশেষ গোপনীয় নথির প্রকাশ নিঃসন্দেহে ব্রিটেন ও ভারতে শিখদের এবং প্রত্যেক অঞ্চলের সাম্রাজ্যবাদ বিরোধীদের ক্ষিপ্ত করবে।

লন্ডন থেকে প্রকাশিত সোশ্যালিষ্ট ওয়ার্কার অনলাইন থেকে অনুদিত


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পরকীকরণ: মার্কসের তত্ত্বের ভূমিকা

ক্রিস্টাল ফিল্ড তত্ত্ব স ম আজাদ

পণ্যপুঁজা: যুডি কক্স