পর্নোগ্রাফির খেসারত



.
পর্নোগ্রাফির খেসারত

মূল: এমি লেদার     অনুবাদ: স ম আজাদ

পর্নোগ্রাফির খেসারত

মূল: এমি লেদার     অনুবাদ: স ম আজাদ

সমাজতন্ত্রীরা পর্নোগ্রাফির বিরুদ্ধে। আমরা দেখি না যে পর্নোগ্রাফি হলো নারী নির্যাতনের কারণ অথবা মনে করি না যে যদি পর্নো দূর হয় নারীর বিরুদ্ধে কোনো সহিংসতা থাকবে না। আমরা পর্নোগ্রাফির রাষ্ট্রীয় সেন্সরশীপ সমর্থন করি না। কিন্তু আমরা পর্নোর বিরোধীতা করি। প্রধান ধারার পর্নোগ্রাফিতে নারীর বিরুদ্ধে দৈহিক ও মৌখিক আক্রমণ হলো ব্যতিক্রমের পরিবর্তে বরং সাধারণ নিয়ম। ২০০৭এর একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যায় যে সবচেয়ে দামী শিরোনামের পর্নোগুলোর ৫০টির অধিকাংশের দৃশ্যগুলোতে নারী পরিবেশনকারীদের দৈহিক ও মৌখিক অপব্যবহার বিদ্যমান।
ইন্টারনেটের কিছু অন্ধকার নিভৃত জায়গায় ওৎ পেতে থাকার পরিবর্তে বরং এই ছবিগুলো সহজপ্রাপ্য এবং ফ্রি। এটিই হলো ব্যাপকভাবে তৈরীকৃত প্রধান ধারার পর্নোর প্রকৃতি। ইন্টারনেট রূপান্তরিত করেছে কীভাবে পর্নো দেখা হবে এবং সহজে প্রবেশ্য দৃশ্যগুলোর প্রকারভেদে। ২০০৯-এর একটি জরিপে দেখা গেছে যে তখন ইন্টারনেটে ৪২০ মিলিয়ন পর্নো পৃষ্ঠা ছিল। প্রত্যেকদিন পর্নোর জন্য ৬৮ মিলিয়ন সার্চ ইঞ্জিন অনুরোধ ছিল। কম্পিউটারে মৌলিক দক্ষতাসম্পন্ন যে কেউ সহজে পর্নোতে প্রবেশ করতে পারে অল্প কয়েকটি ক্লিক দিয়ে। মোবাইল ফোনেও পর্নো দেখা যেতে পারে। পর্নোগ্রাফিতে প্রথম প্রবেশ করা মানুষের গড় বয়স হলো এগার। সুতরাং যৌনতা কী- এ সম্পর্কে কৌতুহলী শিশুদের ধারণা লাভকরণ অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে সহজতর পর্নোগ্রাফি থেকে, যার সঙ্গে প্রকৃত যৌনতার সম্পর্ক কদাচিৎ বিদ্যমান। পুঁজিতন্ত্রের উপলব্ধি এবং এটি কী দ্বারা পরিচালিত হয়- এ বিষয়গুলো সাহায্য করে বুঝতে কেন পর্নো যেভাবে বিদ্যমান সেভাবে এটি বিকশিত হয়েছে। পর্নোগ্রাফির মার্কসবাদী উপলব্ধি পর্নোগ্রাফিকে স্বাতন্ত্রিক মানুষ, বা বাস্তবিকই সমস্ত মানুষের সমস্যা হিসেবে দেখে না। পরিবর্তে এটি পর্নোগ্রাফিকে দেখে পুঁজিতান্ত্রিক সমাজের প্রেক্ষাপটে এবং কীভাবে ঐ ব্যবস্থার যুক্তি দ্বারা এটি পরিচালিত হয়। পুঁজিতন্ত্র পরিচালিত হয় প্রতিযোগিতা ও মুনাফা দিয়ে। জীবনের প্রত্যেকটি ক্ষেত্র থেকে এটি টাকা বানানোর পথ সন্ধান করে এবং প্রত্যেক বিষয়কে পণ্যে পরিণত করে, অর্থাৎ যা কেনা বেচা করা যায়। আমাদের আবেগ এবং আমাদের যৌনতাকেও  তা অন্তর্ভুক্ত করে।
সমাজতন্ত্রীরা যৌনতা সম্পর্কে আরো অধিক অকপটতা (openness) দাবী করে। এটি ছিল ১৯৬০-এর দশকের নারী মুক্তি আন্দোলনের দাবীসমূহের একটি। তাহলো কেবলমাত্র প্রজননের জন্য নয়, যৌনক্রিয়া আনন্দের জন্যেও হওয়া উচিত, প্রয়োজন ও ইচ্ছাসহ নারীরাও যৌন সত্তা। কিন্তু পর্নোগ্রাফি আমাদের যৌনজীবনকে অধিকতর ভালো করার জন্য নয়, এটি টাকা বানানোর জন্য । পর্নোগ্রাফি বড় ব্যবসায়, বাস্তবিকই খুবই বড় ব্যবসায়। নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া দুষ্কর, তবে অনুমান করা হয় যে ২০০৬-এ বৈশ্বিক পর্নো শিল্পের পরিমাণ ছিল ৯৬ বিলিয়ন ডলারের।

ব্যবসায়

এটি পুঁজিতন্ত্র থেকে বিচ্ছিন্নভাবে বিরাজ করে না। এটি প্রধান ধারার অনেক ব্যবসায়ের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত, তাদেরকেও মুনাফা তৈরীতে সহায়তা করে। যারা পর্নো তৈরী করে তারা টাকা বানায়, একইভাবে যারা এটি বিতরণ করে তারাও টাকা বানায়। যে ব্যাংকারা এই শিল্পে অর্থায়ন করে, তারাও তাদের  ঋণগুলোর সুদ থেকে টাকা বানায়। মানুষের পর্নো দেখার জন্য যারা সফটওয়ার উদ্ভাবন করে, তারাও টাকা বানায়। হলিডে ইন, ম্যারিয়ট ও হিলটনের মতন হোটেল চেইনগুলো অর্থের বিনিময়ে এটি প্রতিবার প্রদর্শন করে একই কাজ করে। মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট কোম্পানিগুলোও এটিতে প্রবেশের ব্যবস্থা করে তাই করে। ২০১০-এ পর্নোগ্রাফির জন্য মোবাইল ফোনের বাজার ছিল আনুমানিক ৩.৫ বিলিয়ন ডলার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে টাইম ওয়ার্নার ক্যাবলের মতন ক্যাবল কোম্পানিগুলো ও পরিবেশকগুলো অ্যাডাল্ট ভিডিও থেকে মিলিয়ন মিলিয়ন টাকা বানায় চাহিদার ভিত্তিতে প্রতি প্রদর্শনী বিক্রয় লব্ধ অর্থ থেকে। পর্নো ব্যবহারকারী জনগণের নিকট থেকে গুগল ও ইয়াহুর মতন সার্চ ইঞ্জিনগুলোও টাকা বানায়। সুতরাং অর্থ, মিডিয়া ও যোগাযোগের মতন প্রধান ধারার ব্যবসায়সমূহের সঙ্গে পর্নো শিল্পের সম্পর্ক বিদ্যমান। এর রয়েছে শক্তিশালী সহযোগী। অন্যান্য পুঁজিতান্ত্রিক শিল্পগুলোর মতন পর্নোগ্রাফিও পরিচালিত হয় প্রতিযোগিতা দিয়ে। এটি প্রধান ধারার পর্নোগ্রাফি বাজারে অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে অধিকতর খোলামেলা দৃশ্যকল্পসমূহ ((explicit imagery)-এর বর্ধিষ্ণু মাত্রায় গ্রহনযোগ্যতার দিকে ধাবিত করে। এবং এটি আরো হার্ডকোর বিষয়সমূহের গণ বন্টনের পথ খুলে দেয়।
অধিকাংশ ভাষ্যকারগণ একমত পোষণ করেন যে পর্নোর বর্তমান রূপের উৎস হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে ১৯৫৩-এ  Hugh Heffner কর্তৃক প্লেবয় ম্যাগাজিনের যাত্রারম্ভকরণ। খোলামেলা ছবিসমূহ এটির পূর্বেও অবশ্যি বিদ্যমান ছিল, কিন্তু সেগুলো সাধারণ দর্শকের নিকট পৌঁছায়নি, যা প্লেবয় অর্জন করেছিল। এটি নিজেকে বিপণনকৃত করেছিল একটি লাইফস্টাইল ম্যাগাজিন হিসেবে কিন্তু  এতে অন্তর্ভুক্ত ছিল একটি পর্নো সেন্টারফোল্ড। ১৯৬০-এর দশকের শেষ নাগাদ এর সার্কুলেশন সংখ্যা জানামতে সর্বোচ্চ ৪.৫ মিলিয়নে পৌঁছে। এবং অন্য সবাই তাদের নিজেদের জন্য এর পদ্ধতি নকল করে দ্রত টাকা বানাতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে ।
পেন্টহাউজের যাত্রা শুরু হয় ১৯৭০-এর দশকে। এটি প্লেবয়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করেছিল এর ছবিগুলোকে আরো খোলামেলা করে। ১৯৭১-এর আগস্টে এটি এর প্রথম পূর্ণ ফ্রন্টাল সেন্টারফোল্ড ছাপায়। প্লেবয় তখন এটি অনুসরণের চাপের মধে পড়ে যায় এবং এটি তারা জানুয়ারি ১৯৭২-এর সম্পন্ন করে। আরো খোলামেলা ও উত্তেজক ছবিসমূহ তৈরী করে প্রতিদ্বন্দীদের অতিক্রম করার এই প্রতিযোগিতা আজও বিদ্যমান।
পর্নোগ্রাফি যৌনতা গ্রহণ করে এবং এটিকে বিক্রয়যোগ্য উৎপন্ন দ্রব্যে পরিণত করে। লেখক গেইল ডাইনস যৌন ছবিসমূহের গণ উৎপাদনকে তুলনা করেন  শিল্পোৎপন্ন দ্রব্য হিসেবে। অধিকাংশ পর্নোগ্রাফি চরমভাবে  যান্ত্রিক এবং সংকীর্ণ কারণ এটি গণ-উৎপন্ন (mass product)) ও বিপণনকরণের জন্য প্যাকেটজাত করা হয়। এটি জটিল হতে পারে না অথবা যৌনতার বি্তৃতি আবিষ্কার করতে পারে না। যৌনতার দিগন্ত সম্প্রসারিতকরণের পরিবর্তে বরং এটি তা সীমাবদ্ধ করে। যৌনতা কী  এবং পুরুষ ও নারী এটি থেকে কী চায় Ñ এই স্টেরিওটাইপের ওপর ভিত্তি করে এটি যৌনতার খুবই সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিকে বিক্রয় করে। যৌনতা কী, তারই একটি বিশেষায়িত নির্মাণ হলো পর্নো। এটিতে অভিনয় করে যে মানুষজন তাদেরকে এটি করার জন্য পারিশ্রমিক দেওয়া হয়। সুতরাং এতে জড়িত অধিকাংশ নারী হলো ছিপছিপে, টোনকৃত, বৃহৎ স্তন বিশিষ্ট, প্রায়ই সার্জারি করে স্ফীতকৃত, চুলবিহিন, যারা সাধারণত বøন্ড বিশিষ্ট হয়ে থাকে।  

আকাঙ্খা

এটি এর দর্শকদের সন্তুষ্ট করতে পরিকল্পিত হয়নি। বরং এটি পরিকল্পিত হয় দর্শকদের আরো চাহিদার মধ্যে রেখে দেয়ার জন্য যাতে তারা আরো পর্নো ক্রয় করে। এটি নারী মুক্তির জন্য নয়। পর্নোগ্রাফিতে নারীদের নিজস্ব যৌনাকাঙ্খা নেই। পুরুষ যা চায় তাই তাদের ইচ্ছাতে পরিণত হয়।
১৯৭০-এর দশকে আন্ড্রেই ডোরকিন ও সুসান ব্রাউনমিলারের মতন কিছু র‌্যাডিক্যাল নারীবাদী উপসংহার টানেন যে পর্নো নারীদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস তৈরী করে। কিন্তু সমাজতন্ত্রীরা যুক্তি দেন যে এর আর একটি দিক আছে। পর্নোগ্রাফি নারী নির্যাতনের কারণ নয়, এটি নারী নির্যাতনের প্রতিফলন এবং এটিকে বৃদ্ধি করে। বিলবোর্ড বিজ্ঞাপন অথবা সিনেমা বা সঙ্গীতের লিঙ্গ স্টেরিওটাইপ,যাই হোক না কেন, জনপ্রিয় সংস্কৃতি একই ভুমিকা পালন করে। সান নিউজ পেপারের অশ্লীল তৃতীয় পৃষ্ঠাটি একই ভুমিকা পালন করে।
শ্রেণী সমাজে, বিশেষত পরিবার নামক প্রতিষ্ঠানে নারী নির্যাতনের বস্তুগত ভিত্তি ও শেকড় বিদ্যমান। আপনি ঐতিহ্যবাহী পরিবারে বসবাস করুন আর নাই করুন, এটিকে ভাবাদর্শিকভাবে ব্যবহার করা হয় এবং আদর্শ হিসাবে গণ্য করা হয় যাতে এর নিকটবর্তী, সমকক্ষ হওয়া যায় অথবা এটিকে ছাড়িয়ে যেতে চেষ্টা করা যায়। প্রধানত পরিবারের মাধ্যমে সমাজ অভ্যন্তরে নারী ও পুরুষের সামাজিকীকরণ করা হয় ভিন্ন ভিন্ন ভুমিকাতে। নারীর ব্যাপক অগ্রগতি সত্তে¡, তারা এখন পর্যন্ত শিশু-যতœ, রান্না-বান্না ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দায়িত্ব বহন করে। ছেলেরা আরো আক্রমণাত্মক হবে এবং আবেগ দেখাবে না বলে প্রত্যাশা করা হয়। মেয়েরা প্রতিপালন মনোভাবান্ন ও উপকারি হবে বলে প্রত্যাশা করা হয়। যৌনতার বিষয়ে নারী ও পুরুষ ভিন্ন ভিন্ন ভুমিকা দেখাবে। জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে যৌনতাকে দেখানো হয় এমন একটি বিষয় হিসেবে যা নারীর ওপর সম্পন্ন হয় যদি না তারা পুরুষকে আনন্দ দেয়।
পর্নোগ্রাফি ইতোমধ্যে বিদ্যমান নির্যাতনকে প্রতিফলিত করে, কিন্তু আরো চরম রূপে। নারীর বিরুদ্ধে সন্ত্রাসে পর্নোগ্রাফি সরাসরি দায়ী নয়- এ কথা বলার সঙ্গে এর সঙ্গে কোনো প্রভাব নেই এ কথা এক নয়। এটি নারীকে যৌন বস্তু হিসেবে দেখাতে সমর্থন দেয়। এটি নারীকে অবমানিত করে এবং লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে। পর্নো উৎপাদনে নারী পারফরমার দুর্ভোগ পোহাতে পারে। কিন্তু তার থেকে গুরুত্বপূর্ণ হলো এটি আমাদের যৌনতাকে বিকৃত করে। এটি যৌনতাকে ধারণ করে মানব সম্পর্কের ওপর কিছু একটা ভিত্তি করে, এবং তারপর এটি প্রদর্শন করে মানবিক সম্পর্ক ছাড়া।
দক্ষিণপন্থীদের অনেকেই আরো সেন্সরশীপ চায়, কিন্তু যৌনতা কী দ্বারা গঠিত এ বিষয়ে তাদের সংকীর্ণ ও নৈতিকতাবাদী দৃষ্টি বিদ্যমান। তারা কম উম্মুক্ততা চায়। নির্দিষ্ট যৌন কর্মের নৈতিক আপত্তি থেকে অথবা এমন একটা কিছু আছে যা স্বাভাবিক যৌনতাকে গঠন করে এর ওপর ভিত্তি করে সমাজতন্ত্রীরা পর্নোকে বিরোধীতা করে না। আমরা রাষ্ট্রের ক্ষমতাকে বাড়াতে চাই না। এ ধরনের ক্ষমতা অনেক সময় অনুমানমূলক লক্ষ্যবস্তুর চেয়ে বরং সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ব্যবহার হয়।
যৌনতা সম্পর্কে আমরা আরো অধিক উম্মুক্ততা, সততা ও তথ্য চাই। কিন্তু যৌনাবেদনময়ীতা কী অথবা যৌনতা কী তার গৎবাঁধা (formulaic), বর্ণনাকৃত (scripted) উপস্থাপনা এর স্টেরিওটাইপের ওপর ভিত্তি করে আমরা এটি চাই না। তার অর্থ এখন আমাদের সংগ্রাম করতে হবে এই বিষয়গুলোর জন্যÑ বিদ্যালয়গুলোতে যথাযথ যৌন শিক্ষা. যুব সেবাসমূহ যেগুলো তরুণ জনসম্প্রদায়কে উপদেশ এবং সমর্থন দিতে পারে।
কিন্তু এর অর্থ একটি ভিন্ন প্রকারের সমাজের জন্য সংগ্রাম যেখানে দ্রত মুনাফা বানাতে প্রত্যেকটি আবেগকে পণ্যায়িত করা হয় না। 

[লন্ডন থেকে প্রকাশিত সোস্যালিস্ট ওয়ার্কার অনলাইন থেকে অনুদিত]

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পরকীকরণ: মার্কসের তত্ত্বের ভূমিকা

ক্রিস্টাল ফিল্ড তত্ত্ব স ম আজাদ

পণ্যপুঁজা: যুডি কক্স