রক্তস্নাত সাম্রাজ্য



Image may contain: one or more people
রক্তস্নাত সাম্রাজ্য
মূল: কেন ওলেন্ডে অনুবাদ: আজাদ
অনুবাদকের উৎসর্গ: সদ্য অকাল প্রয়াত অনুজা প্রতিম ফিরোজা নার্গিস ডলির স্মৃতির উদ্দেশ্যে

যাবৎকাল জানা সাম্রাজ্যগুলোর মধ্যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ছিলো বৃহত্তম। দুনিয়ার স্থলভাগের এক-পশ্চমাংশ এদের দখলে ছিলো এবং এর জনসংখ্যার এক-পশ্চমাংশ এরা শাসন করেছিল। যেমনটি ১৮৫১- মিলিট্যান্ট চার্টিস্ট নেতা আর্নেস্ট জোনস বলেছিলেন, “এর উপনিবেশগুলোতে কখনো সূর্যাস্ত হতো না, কিন্তু রক্তও কখনো শুকাতো না।
বর্তমানে সাম্রাজ্যের অবশেষরূপে যা বিদ্যমান আছে তাহ কতিপয় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অঞ্চলসমূহ (territories)), যেমন জিব্রালটার, ফকল্যান্ডস দ্বীপ এবং দুনিয়ার দূরতম বসবাসকৃত দ্বীপ, ট্রিস্টান ডা কুনহা (Tristan da Cunha)
গর্ডন ব্রাউন সাম্প্রতিক সময়ে স্টকল্যান্ডের সঙ্গে ইউনিয়ন সংবর্ধিতকরণে পুনরাবির্ভূত হন। তিনি ২০০৬এ বলেন, “এর ঔপনিবেশিক ইতিহাসের জন্য ব্রিটেনের ক্ষমা প্রার্থনার দিন শেষ। এর জন্য ক্ষমা চাওয়ার পরিবর্তে বরং আমাদের উদযাপন করা উচিত আমাদের অধিকাংশ অতীতের জন্য।সত্য এই যে সামরিক বিজয় দিয়ে সাম্রাজ্য জেতা হয়েছিল এবং মুনাফার স্বার্থে বল প্রয়োগে ধরে রাখা হয়েছিল।
সতেরো শতকে ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের বাইরে সাম্রাজ্যের বিস্তারণ শুরু হয়। ১৬০৯- ইংরেজ স্কট বসতিস্থাপনকারীদের আয়ারল্যান্ডে পাঠানো হয় “Plantation of Ulster” স্থাপন করতে। নেটিভদের উৎখাত করে অথবা তাদের প্রজায় রূপান্তরিত করে তারা জমির উন্নয়ন করেন। ব্রিটিশ, ওলন্ডাজ ফরাসিরা সকলে তাদের নিজেদের আইনিক জলদস্যুতা ক্যারিবিয় অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত করেন।

উত্তর আমেরিকার ভার্জিনিয়াতে প্রথম দিকের ব্রিটিশ বসতিস্থাপনকারীদের খাদ্য অন্বেষণে উৎপাদনে সহায়তা করেন স্থানীয় Alginquin জনগণ। কিন্তু বসতিস্থাপনকারীদের একবার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলে, তারা নেটিভদের বিরুদ্ধেলাগাতার যুদ্ধ” ((Perpetual war) যুদ্ধ ঘোষণা করেন পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাকরতে। তারা গ্রামগুলি গুড়িয়ে দেয়, শস্যাবলী উপড়ে দেয় এবং জনগণকেনৃতাত্ত্বিকভাবেউৎখাত করে। ১৬২৩- ব্রিটিশগণ অ্যালগনকুইনদের সাথে আলোচনায় বসে। তারা বিষমিশ্রিত মদ পরিবশেন করে যাতে ২০ নেটিভ মৃত্যুবরণ করেন।
জনগণ কখনও কখনও ভুলে যায় যেমার্কিন অভিযাত্রীদেরঅনেক পূর্বেই ব্রিটিশ বসতিরা পূর্ব-উত্তর আমেরিকার নেটিভদের উৎখাত করে। কিছু জনগোষ্ঠীর দুর্ভাগ্য এতটাই যে তারা  উভয় অভিযাত্রীদের দ্বারা আক্রান্ত হয়। চেরোকি জনগোষ্ঠী বসবাস করতেন পূর্ব অ্যাপালাসিয়ান পর্বতমালায় তারা ব্রিটিশদের বলপ্রয়োগে পশ্চিমে যেতে বাধ্য হন এবং পরবর্তীতে আবার আক্রান্ত হয় মার্কিনস্পষ্ট প্রতীয়মান নিয়তি” (Manifest destiny) দ্বারা। বিজয় অবিমিশ্র  ছিল না। আজকের দিনে যাকে পিটসবার্গ বলা হয় তার নিকটে ব্রিটিশ সেনাদল ৬০০ নেটিভ আমেরিকান গেরিলা দ্বারা হঠাৎ আক্রান্ত হয়। আমেরিকায় ব্রিটিশ বাহিনীর প্রধান জেনারেল এডওয়ার্ড ব্র্যাডকসহ হাজার হাজার সৈন্য মৃত্যুবরণ করে। নেটিভরা ফরাসিদের সাথে মৈত্রীজোট বেঁধেছিল এবং এটা প্রায়ই ঘটতো যে একটি সাম্রাজ্যবাদী শক্তি অপরটির বিরুদ্ধে বিদ্রোহীদের সাহায্যে এগিয়ে আসত। তারা কখনও নির্ভরযোগ্য মিত্র ছিল না।
উপনিবেশগুলোতে প্রথমে তামাক এবং পরবর্তীতে চিনি উৎপাদন করা হয় এবং তার অনেক পূর্বে আফ্রিকান দাসসমূহ শ্রমশক্তির যোগান দিচ্ছিল। ট্রান্স-আটলান্টিক দাস ব্যবসায়ে উন্নতির কেন্দ্রে ছিলো ব্রিটেন। এটি থেকে বানানো টাকা দিয়ে অনেক ব্যাংক ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা হয়, যেগুলো এখন পর্যন্ত টিকে আছে।
কিন্তু দাসপ্রথা প্রত্যেকটি পর্যায়ে প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়। ১৭৬০- জামাইকাতে হাজার হাজার দাস বিদ্রোহ করে। রাজকীয় ইতিহাসবিদ এডওয়ার্ড লং তাদের নেতা ট্যাকিকে এই বলে খারিজ করে দেন যেঅসাধারণ প্রতিভাবান হিসেবে দৃশ্যমান হননি কিন্তু দাসগণ ব্রিটিশ সেনাদের দাবিয়ে রাখতে সমর্থ হয় বছরের অধিককাল ধরে। Toussaint L’Ouverture যিনি ফরাসি ঔপনিবেশিকদের  উৎখাত করেন, তাঁর নেতৃত্বে সংঘটিত বৃহত্তম দাস বিদ্রোহে ব্রিটিশরা হস্তক্ষেপের চেষ্টা করে। কিন্তু সাম্রাজ্য অপমানকর পরাজয় বরণ করে।
সাম্রাজ্যেরশিক্ষা” (moral)) দাসত্ব-বিরোধীতে পরিবর্তন প্রণোদিত হয় দাসবিদ্রোহসমূহ এবং ব্রিটিশ পুঁজিতন্ত্রের  পরিবর্তিত প্রয়োজনসমূহের সমন্বয় দ্বারা। শাসকশ্রেণীর একাংশ হিসেব কষে দেখে যে শ্রমিকদের শোষণ করে তারা আরও মুনাফা লুটতে পারে, এবং সেটিই আন্তর্জাতিক দাস ব্যবসায়ের অবসানে তাদের বাধ্য করে, এই অবসান তাদের বিদেশী প্রতিযোগীদের ক্ষতিগ্রস্থ করতে সমর্থ। তাদের ভন্ডামি স্পষ্ট প্রতীয়মান ছিল। ১৮৩৩- সাম্রাজ্যে দাসপ্রথা বাতিলের পর দাসমালিকদের ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়, কিন্তু দাসদের কোনো ক্ষতিপূরণ দেয়া হয় না। এই দাসমালিকদের দখলে থাকা দাসদের রেখে দেয়ার অনুমতি দেয়া হয়, কারণ তারা ছিল মালিকদেরসম্পত্তি ব্রিটিশরা তার মার্কিন উপনিবেশ হারালে এশিয়া এবং পরে আফ্রিকার দিকে নজর দেয়। ভারত ছিল তাদের “Jewell in the Crown”, সেই ভারত শাসন করতে আসে প্রথমে খন্ডিতভাবে। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রথম দিকে তাদের প্রতিষ্ঠিত ট্রেডিং পোস্টসমূহ যে এলাকাগুলোতে বিদ্যমান ছিলো, সেগুলোর নিয়ন্ত্রণভার নেয়, তারপর দ্রুত ভূভাগ অভ্যন্তরে ধাবিত হয়। এই প্রক্রিয়াতে তারা বিদ্যমান শিল্পকারখানাসমূহ, বিশেষত টেক্সটাইল মিলগুলো উত্তরোত্তর রুগ্ন করে ফেলে। ব্রিটেনের মিল-ফ্যাক্টরিসমূহে রপ্তানির জন্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি  ভারতীয় কাঁচা তুলা মজুদ করে, তারপর দেশীয় বাজারসমূহ ভাসিয়ে দেয় সস্তা বস্ত্রসম্ভার দিয়ে, এসবই তারা করে মুক্ত ব্যবসায়ের নামে।
কিন্তু দাসত্ব সত্ত্বেও, এটা খুব দূরের কথা নয় যে ভারতের জনগণ ব্রিটিশ শাসনকে নিন্দা করে এবং এই শাসনের বিরুদ্ধে সংগঠিত হয়। ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর ভারতীয় সৈনিকগণ বিদ্রোহ সংঘটিত করেন এবং ১৮৫৭এ তাদের বন্দুকগুলো ইংরেজ অফিসারদের দিকে তাক করে। শহরের পর শহর বিদ্রোহীদের নিকট পদানত হয় এবং এমনকি রাজধানী দিল্লীও তাদের দখলে আসে।
ব্রিটিশরা অবমানিত হয় এবং নিষ্ঠুর প্রতিশোধ নেয় অবশেষে দিল্লী ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণে এলে একজন সাম্রাজ্যবাদী উল্লসিতভাবে পরবর্তীতে সংঘটিত ম্যাসাকার সম্পর্কে নিস্পৃহভাবে  স্মরণ করেন।
কিছু বাড়িতে ৪০ও ৫০ জন মানুষ লুকিয়েছিল। তারা বিদ্রোহী ছিল না, বরং নগরীর বাসিন্দা ছিল। তারা ক্ষমার জন্য আমাদের মৃদু শাসনে বিশ্বাস রাখতেন। আমি বলে আনন্দিত যে তারা হতাশ হয়েছিল।তিনি দম্ভোক্তি করেছিলেন।
জর্জ কার্টার স্টেন্ট নামে একজন ব্রিটিশ সৈনিক বিদ্রোহীদের জন্য পছন্দের শাস্তি অবলোকন করেছিলেন, তিনি স্মরণ করেন - সেটি ছিল  “বন্দুক দিয়ে উড়িয়ে দেয়াযখন বন্দুক দিয়ে গুলি করা হয়, তার মস্তক ৪০ বা ৫০ ফুট বাতাসে উপরে উঠতে দেখা যায়, দুটি বাহু বাতাসে অনেক উপরে ডানে বায়ে উড়ে যায় এবং সম্ভবত ১০০ গজ দূরে পতিত হয়, পাগুলো বন্দুকের মুখের নীচে মাটিতে পতিত হয় এবং দেহটি অনতিরঞ্জিতভাবে সম্পূর্ণত উড়ে যায়,” তিনি কৌতুকচ্ছলে বয়ান করেন
কিন্তু এর বর্ধিত নৃশংসতা সত্ত্বেও সাম্রাজ্য টেকসই হয়নি। অধিক বিদ্রোহ এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের আক্রমণ ব্রিটিশদের বাধ্য করে তাদের লুন্ঠনকৃত সম্পদের একটি অংশতাদের টেরিটরিসমূহএর রক্ষণে স্থানান্তর করতে।
একইসময়ে নয়া অর্থনৈতিক শক্তিসমূহের উত্থান ঘটছিল। এই শক্তিসমূহের সমৃদ্ধি ঘটছিল ব্রিটিনের নিয়ন্ত্রণ ব্যতিরেকে যা ব্রিটেন তার উপনিবেশগুলোতে প্রয়োগ করতো।
শীঘ্রই এই নয়া ক্ষমতাসমূহ সাম্রাজ্যকে চ্যালেঞ্জকরণের শক্তি অর্জন করেছিল এবং বিজয় অর্জন করেছিল

সোশ্যালিস্ট ওয়ার্কার অনলাইন থেকে অনুবাদকৃত

Source: Tue 23 Sep 2014, 17:28 BST
Issue No. 2422


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পরকীকরণ: মার্কসের তত্ত্বের ভূমিকা

ক্রিস্টাল ফিল্ড তত্ত্ব স ম আজাদ

পণ্যপুঁজা: যুডি কক্স